আগামীর সময়

ন্যাটোতে ইউরোপীয় নেতৃত্ব বাড়ানোর আহ্বান ব্রিটিশ এমপিদের

ন্যাটোতে ইউরোপীয় নেতৃত্ব বাড়ানোর আহ্বান ব্রিটিশ এমপিদের

সংগৃহীত ছবি

সংকটের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পক্ষে প্রতিরক্ষায় এগিয়ে না–ও আসতে পারে, এমন ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’ মাথায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে তার ন্যাটো মিত্রদের। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রভাবশালী এমপি ও লর্ডদের একটি কমিটি এ সতর্কবার্তা দিয়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত জয়েন্ট কমিটি অন দ্য ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও কিয়ার স্টারমারের সরকারের মধ্যে টানাপোড়েন যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্তম্ভকে দুর্বল করে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রিটেনের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার সাবমেরিনে ব্যবহৃত ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও এফ–৩৫ যুদ্ধবিমান কর্মসূচির মতো প্রকল্পে প্রবেশাধিকার।

কমিটি ব্রিটিশ সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে, পারমাণবিক ও গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রচলিত প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, সেখান থেকে সরে আসার পরিকল্পনা নিতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, ইউরোপ ও কানাডাকে ন্যাটোতে আরও বেশি ইউরোপীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে উত্তরণের জন্য একটি পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দিয়েছে তারা।

এমন এক সময়ে এ সতর্কবার্তা এল, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও মিত্র দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাজ্যের সমালোচনা করেছেন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ না দেওয়ার কারণে। তিনি রয়্যাল নেভির দুটি বিমানবাহী রণতরীকে ‘খেলনা’ বলে উপহাস করেন এবং ন্যাটোর অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে ইরানের শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘একেবারেই কিছু করেনি’ বলে অভিযোগ তোলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটোর কাছ থেকে কিছুই প্রয়োজন নেই, তবে ‘এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়টার কথা কখনো ভুলে যেও না’।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আবারও ইঙ্গিত করছে ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে থাকা সম্মিলিত প্রতিরক্ষার অঙ্গীকার, অর্থাৎ একজন মিত্রের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করার নীতি, এখন আর নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাচ্ছে না। ট্রাম্প এর আগেও বারবার দাবি করেছেন, স্টারমার উইনস্টন চার্চিলের মতো নন।

কমিটির ভাষ্য, হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা ন্যাটোর সেই দীর্ঘদিনের ধারণাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে, যেখানে মনে করা হতো ইউরোপে কোনো যুদ্ধ হলে মিত্রদের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীই হবে প্রধান সামরিক শক্তি।

ন্যাটোর শীর্ষ সামরিক অপারেশনাল কমান্ডার, সুপ্রিম অ্যালাইড কমান্ডার সব সময়ই একজন মার্কিনি হয়ে থাকেন। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী স্যাটেলাইট তথ্য, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার জ্যামার ও বিপুল শক্তি প্রয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া শুধু ইউরোপীয় বাহিনী তাই অনেক কম সক্ষম হবে।

গত জুনে প্রকাশিত যুক্তরাজ্যের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল পর্যালোচনা করতে গিয়ে কমিটি বলেছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা যুক্তরাজ্যের অব্যাহত রাখা উচিত। তবে একই সঙ্গে সরকারকে অন্য ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে মিলে ন্যাটোতে আরও বেশি ইউরোপীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘এমন সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, যেখানে সংকটের সময় ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারবে না। সম্ভাব্য এই সরে দাঁড়ানো সামাল দিতে সরকারকে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে নিজেদের সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে।’

কমিটির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা ‘বিশেষ সম্পর্ক’ভিত্তিক গভীর নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের কারণে ট্রান্স-আটলান্টিক বন্ধন দুর্বল হলে যুক্তরাজ্য বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাইডেন্ট ক্ষেপণাস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, এফ–৩৫ কর্মসূচির সরবরাহ ও নতুন আক্রমণাত্মক সাবমেরিন নির্মাণ পরিকল্পনাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল। তবে ট্রাম্প তার অপছন্দের কোনো পদক্ষেপ নিলে মিত্রদের বিরুদ্ধে এই নির্ভরশীলতাকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন বলেও সতর্ক করেছে কমিটি।

এই নির্ভরতার প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এমন কিছু স্পষ্ট টানাপোড়েনের ক্ষেত্র রয়েছে, যা অদূর ভবিষ্যতে এসব নির্ভরতার নির্ভরযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।’

    শেয়ার করুন: