আগামীর সময়

উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পকে ফোন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর, কী কথা হলো

উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পকে ফোন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর, কী কথা হলো

কিয়ার স্টারমার ও ডোনাল্ড ট্রাম্প

ইরান ইস্যুতে যুক্তরাজ্যের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার পর প্রথমবারের মতো ফোনে কথা বলেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ও ট্রাম্প।

ডাউনিং স্ট্রিট থেকে ফোনালাপের সীমিত বিবরণ প্রকাশ করে জানানো হয়— মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এবং যুক্তরাজ্য–যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন দুই নেতা।

শনিবার ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, যুক্তরাজ্য মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে খারিজ করে ট্রাম্প জানালেন,  ‘যুদ্ধ আমরা জিতে যাওয়ার পর যারা এসে যোগ দেয়, তাদের আমাদের দরকার নেই! একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যকে ‘একসময়ের মহান মিত্র’ বলে উল্লেখ করলেন ট্রাম্প।

এর আগে যুক্তরাজ্য প্রধানমন্ত্রী স্টারমার বলেছেন, যুক্তরাজ্য কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেবে না। তবে প্রতিরক্ষামূলক অভিযানের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক হামলা চালানো যায়।

শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হামলায় ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করায় স্টারমারের ওপর বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। এ সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প জানালেন, ‘যুক্তরাজ্যের ওপর সন্তুষ্ট নন’ এবং স্টারমার ‘উইনস্টন চার্চিলও নন’ যোগ করেন ট্রাম্প।

বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েন্সবার্গ’ অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার বলেছেন, ‘ব্রিটেনের স্বার্থ রক্ষায় দাঁড়ানোই স্যার কিয়ার স্টারমারের সঠিক সিদ্ধান্ত।’

‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট তার দেশের জাতীয় স্বার্থ কী মনে করেন, সেটা নির্ধারণ করা তার বিষয়। কিন্তু যুক্তরাজ্য সরকারের দায়িত্ব হলো যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বার্থ কী, তা নির্ধারণ করা। আর এর অর্থ এই নয় যে— অন্য দেশের সঙ্গে সব বিষয়ে একমত হতে হবে বা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অন্যের হাতে তুলে দিতে হবে—মনে করেন স্টার মার।

ফোনালাপের পর ডাউনিং স্ট্রিটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং ওই অঞ্চলে অংশীদার দেশগুলোর যৌথ আত্মরক্ষার সহায়তায় আরএএফ ঘাঁটি ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য–যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন দুই নেতা।’

এতে আরও বলা হয়, ‘ছয়জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মার্কিন জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শিগগিরই আবার কথা বলার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এই দুই নেতা।’

ট্রাম্পের সমালোচনার পরও ডাউনিং স্ট্রিট প্রথম থেকেই বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে প্রাথমিক হামলায় অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা অটল এবং বৃহত্তর সামরিক অভিযানে যুক্তরাজ্য অংশ নিতে চায় না।
ইরান যদি মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়, যেখানে ব্রিটিশ নাগরিকরা অবস্থান করছেন, তখন যুক্তরাজ্য ‘প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা’ দেওয়ার আশ্বাস দেন কুপার।

ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যের যুদ্ধবিমানগুলোকে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে, যাতে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করা যায়। ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরি এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। তবে সেটি মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে কিনা, সে বিষয়ে নিশ্চিত করেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী।


শুক্রবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এক ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানে বলেন, যুক্তরাজ্যের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পক্ষে থাকা উচিত ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তার জন্য ‘অপরিহার্য ভিত্তি’ এবং মিত্রদের ‘যেই প্রেসিডেন্ট থাকুক না কেন, পাশে দাঁড়ানো উচিত’ — মনে করেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।

২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যকে যুক্ত করার সময় কুপার ব্লেয়ার সরকারের একজন কনিষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, ওই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

‘কিছু রাজনীতিবিদ মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র যা বলবে, আমাদের প্রশ্নহীনভাবে তা মেনে নেওয়া উচিত। আবার কেউ কেউ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কখনোই যৌথ পদক্ষেপে যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু এই দুই অবস্থানের কোনোটিই সঠিক নয়’ মনে করেন কুপার।

একই অনুষ্ঠানে লন্ডনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত সেয়েদ আলি মুসাভি যুক্তরাজ্যকে সতর্ক করে বলছিলেন, যুদ্ধে আরও জড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে ব্রিটেনকে ‘খুব সতর্ক’ থাকতে হবে।

‘ইরানি জাতির বিরুদ্ধে যদি কোনো স্থাপনা, সম্পদ বা ঘাঁটি ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেগুলোকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে’— যোগ করেন সেয়েদ আলী।

রিফর্ম ইউকের রবার্ট জেনরিক দাবি করেন, তার দল ইরানের ওপর আক্রমণাত্মক বোমা হামলায় যুক্তরাজ্যের অংশগ্রহণ সমর্থন করে না। তবে শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর ‘দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে’ যোগ করেন জেনরিক।

স্কাই নিউজকে কনজারভেটিভ দলের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিল্প বলেন, সংঘাত শুরুর আগেই সাইপ্রাস বা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ না পাঠিয়ে সরকার ‘দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে।’

‘সমস্যা হলো, এই মুহূর্তে সেই জাহাজগুলো সাইপ্রাস বা উপসাগরীয় অঞ্চলের কোথাও নেই। সেগুলো পোর্টসমাউথের ডকে বাঁধা রয়েছে। কারণ কিয়ার স্টারমার ও লেবার সরকার কোনো দূরদর্শিতা দেখায়নি।’ উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এদিকে সম্প্রতি একটি ছোট ড্রোন সাইপ্রাসের আরএএফ অ্যাক্রোটিরি ঘাঁটির রানওয়েতে আঘাত হানে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এতে ‘সামান্য ক্ষতি’ হয়েছে।

বিমান প্রতিরক্ষা সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস ড্রাগন বর্তমানে পোর্টসমাউথে রয়েছে এবং সাইপ্রাসের অ্যাক্রোটিরি ঘাঁটির নিরাপত্তা জোরদারে সেটিকে ভূমধ্যসাগরে পাঠানো হচ্ছে। তবে আগামী সপ্তাহের আগে সেটি যাত্রা শুরু করবে না।

এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসের নাবিকদেরও পাঁচ দিনের মধ্যে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

সংঘাতে যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া ধীর ছিল কিনা— এমন প্রশ্নের জবাবে কুপার বলছিলেন, যুক্তরাজ্য আগে থেকেই ওই অঞ্চলে যুদ্ধবিমান ও অতিরিক্ত ৪০০ সেনা মোতায়েন করেছিল।

সংঘাত শুরু হওয়ার পর আরও টাইফুন যুদ্ধবিমান ও ওয়াইল্ডক্যাট হেলিকপ্টার পাঠানো হয়েছে—যোগ করেন কুপার।

এদিকে লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা এড ডেভি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে রাজা চার্লসের নির্ধারিত সফর বাতিল করা উচিত।

এমন সময়ে, যখন ট্রাম্প একটি অবৈধ যুদ্ধ শুরু করেছেন যা মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংস করছে এবং ব্রিটিশদের জ্বালানি ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, তখন স্পষ্ট যে এই সফরটি হওয়া উচিত নয়, মনে করেন ডেভি।

আমাদের রাজার পক্ষ থেকে একটি রাষ্ট্রীয় সফর ট্রাম্পের জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হবে। অথচ তিনি বারবার আমাদের দেশকে অপমান ও ক্ষতিগ্রস্ত করছেন বলে ক্ষোভ ঝাড়লেন ডেভি।


    শেয়ার করুন: