পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন
প্রত্যাবর্তনের পথে তৃণমূল, ঘাড়ে গরম নিশ্বাস বিজেপির

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন পর্ব মিটতেই ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রে স্পটলাইট এখন একেবারে পশ্চিমবঙ্গের ওপর। কেরালা, তামিলনাড়ু, আসাম এবং পুদুচেরিতে ৯ এপ্রিল এক দফার ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনার আসল কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গ। ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট দিয়ে সাড়ে ছয় কোটিরও বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন গণতন্ত্রের উৎসবে। ২৯৪ আসনের এই নির্বাচনে ম্যাজিক সংখ্যা ১৪৮। কে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যে পৌঁছবে তা নিয়েই চলছে জোর হিসাব।
সংখ্যার লড়াইয়ে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস প্রায় সব আসনেই প্রার্থী দিয়ে শক্তি দেখিয়েছে সংগঠনের। প্রায় সমসংখ্যক আসনে প্রার্থী দিয়ে সরাসরি ক্ষমতা দখলের লড়াইকে স্পষ্ট করেছে ভারতীয় জনতা পার্টিও (বিজেপি)। অধিকাংশ আসনে প্রার্থী দিয়ে তৃতীয় শক্তির উপস্থিতি বজায় রেখেছে কংগ্রেস এবং বাম জোটও। ফলে লড়াই কার্যত দুই শিবিরে সীমাবদ্ধ হলেও ত্রিমুখী প্রভাব যে পুরোপুরি উধাও নয়, তা স্পষ্ট।
ভোটের দিনগুলোতে উত্তেজনা এবং অভিযোগ পাশাপাশি চলেছে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ইভিএম বিকল হওয়া, বুথ দখলের অভিযোগ সামনে এসেছে। প্রথম দফায় ১৫২টি এবং দ্বিতীয় দফায় ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। তবে নির্বাচন কমিশনের কড়া নজরদারি, প্রায় ৮০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য মোতায়েন এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিতে শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছেন।
‘নীল কুঠি’তে কোন ফুল?
৩০ এপ্রিল ২০২৬
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বার্তা লুকিয়ে রয়েছে ভোটদানের হারে। দুই দফাতেই প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পড়া শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং রাজনৈতিক এবং সামাজিক মানসিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন। নাগরিকত্ব ইস্যু এবং ভোটার তালিকা সংশোধন বা এস আই আর ঘিরে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল (৯১ লাখ নাম বাদ পড়ার অভিযোগ), তা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের তাগিদ তৈরি করে। ভোট যেন হয়ে ওঠে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ, নিজের অধিকার রক্ষার এক সরাসরি উপায়।
প্রচারপর্বে দেখা গেছে নজিরবিহীন শক্তির প্রদর্শন। ভারতীয় জনতা পার্টি বাংলা জয়ের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং-সহ একাধিক হেভিওয়েট নেতাকে নামিয়ে আনে। দীর্ঘ সময় ধরে টানা প্রচারে কেন্দ্রের পূর্ণ শক্তি প্রায় ঢেলে দেওয়া হয়। পাল্টা তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সভা করে সংগঠনকে দৃঢ় রাখেন। তার সঙ্গে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব এবং অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উপস্থিতি নির্বাচনী ময়দানকে করে তোলে আরও জমজমাট।
বুথফেরত সমীক্ষায় স্পষ্ট কোনো একমুখী ছবি নেই। কোথাও বিজেপি এগিয়ে, কোথাও তৃণমূল। কিছু সমীক্ষা বিজেপিকে ম্যাজিক সংখ্যার ওপরে দেখাচ্ছে, আবার অন্যগুলো তৃণমূলকে সেই সীমার কাছে বা তার ওপরে রাখছে। পোল অব পোলস বলছে, ব্যবধান এতটাই কম যে, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। অর্থাৎ লড়াই শুধু ঘনিষ্ঠ নয়, প্রায় কাঁটায় কাঁটায়।
কিন্তু বাংলার রাজনীতির অভিজ্ঞতা অন্য সতর্কবার্তা দেয়। গত দুই দশকে একাধিকবার দেখা গেছে এক্সিট পোলের পূর্বাভাস বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে মেলেনি। ৫ থেকে ১০ শতাংশ নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি অমিল ধরা পড়েছে। কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ের সমীক্ষার ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনুমানের সীমাবদ্ধতা। পশ্চিমবঙ্গের জটিল সামাজিক সমীকরণ অনেক সময় পর্দার আড়ালেই থেকে যায়।
এই নির্বাচনের পেছনে কাজ করছে আরও গভীর রাজনৈতিক ইতিহাস। বাম আমলে জমির অধিকারের স্লোগান গ্রামীণ ভোটব্যাংকের ভিত তৈরি করেছিল। ২০১১ সালে সেই শাসনের অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে সরাসরি সরকারি প্রকল্পের সুবিধা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে তৈরি করে নতুন সমীকরণ। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসহ একাধিক প্রকল্প সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলেছে এবং সেই সংযোগ রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিকে আরও বিস্তৃত করেছে।
অভিযোগের ঝড়ও থেমে থাকেনি। দুর্নীতি, অপশাসন, চাকরি-সংক্রান্ত বিতর্ক নিয়ে বিরোধীরা ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ শানিয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই ইস্যুগুলোর প্রভাব কতটা বিস্তৃত তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি প্রকল্পের সুবিধা এবং স্থানীয় স্তরের সংযোগ অনেক সময় ছাপিয়ে যায় এই বিতর্ককে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বলে মত রাজনৈতিক মহলের। ৯০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটদানের হার প্রমাণ করে, মানুষ শুধু দর্শক নয়, সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। স্বাধীনতার পর এত বড় মাত্রায় অংশগ্রহণ বিরল বলেই অনেকে মনে করছেন।
সব মিলিয়ে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা এক কথায় দ্বিমুখী। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত, অন্যদিকে বিরোধী হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টির ক্রমবর্ধমান শক্তি। ফল যা-ই হোক, একটি বিষয় প্রায় নিশ্চিত, ক্ষমতায় যদি প্রত্যাবর্তনও ঘটে, তা আগের মতো নির্ভার নয়। বিরোধীরা এবার কার্যত ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলবে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে চাপ বাড়াবে । আরও তীক্ষ্ণ করে তুলবে রাজনৈতিক সমীকরণকে।
অতএব পশ্চিমবঙ্গের রায় শুধু সরকার নির্ধারণ করবে না, নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ভারসাম্য। প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা এবং বিরোধীর তীব্র উপস্থিতি এই দুইয়ের টানাপড়েনেই গড়ে উঠছে ২০২৬-এর বাংলার নির্বাচনী কাহিনি। ফল ঘোষণার আগ পর্যন্ত এই টানটান উত্তেজনাই মূল সুর হয়ে থাকবে রাজ্য রাজনীতির।





