মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতেও ভাল ফল বিজেপির

সংগৃহীত ছবি
বাংলায় ব্যাপক জয় পেয়েছে বিজেপি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, মুসলিম-অধ্যুষিত জেলাগুলিতেও অপ্রত্যাশিত ফল করেছে পদ্ম শিবির। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং উত্তর দিনাজপুর— এই জেলাগুলিতে তৃণমূলের আধিপত্যের ভিত্তি ছিল মুসলিম ভোট। এই তিন জেলা থেকে বিজেপি এবার অতিরিক্ত ১০টি আসন পেয়েছে।
২০১১ সালে বামফ্রন্টের পতনের পর এই মুসলিম ভোট গিয়েছিল তৃণমূলের ঝুলিতে। ২০২১ সালে বাংলায় বিধানসভা ভোটে পরখ করা গিয়েছিল ব্যাপক ধর্মীয় মেরুকরণ। এবার সেই মুসলিম ভোট আর একচেটিয়া তৃণমূলের পক্ষে যায়নি। এই তিন জেলায় ৪৩টি বিধানসভা আসনে বিজেপি ২০২১ সালে পেয়েছিল ৮টি আসন। আর ২০২৬ সালে এক লাফে তা ১৯-এ পৌঁছেছে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস যারা ৩৫টি আসন নিয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তাদের আসনসংখ্যা কমে এখন এসে ঠেকেছে ২২-এ। বাকি আসনগুলি গিয়েছে কংগ্রেস, সিপিএম এবং হুমায়ুন কবিরের ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’সহ (এজেউপি) অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলির দখলে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটের এই বিভাজনের কারণেই আরও বেশি লাভবান হয়েছে বিজেপি। তাছাড়া অনেকে মনে করেছিলেন, এসআইআরে ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়ার ঘটনা আরও মজবুত করবে তৃণমূলের প্রতি সমর্থন। কিন্তু, কার্যক্ষেত্রে তা হয়নি, নির্বাচনী ফলাফলে বরং দেখা গিয়েছে উল্টো চিত্র।
কৌশলগত ঐক্যের পরিবর্তে, একাধিক বিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে সংখ্যালঘু ভোট। ফলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হওয়া নির্বাচনী কেন্দ্রগুলিতে অনেকটা কমে যায় তৃণমূলের শক্তি। এই রাজনৈতিক পালাবদলে অন্যতম জেলা হিসেবে ওঠে এসেছে মুর্শিদাবাদ। এই জেলার জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশেরও বেশি মুসলিম, তাই এটি একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি হিসেবে ছিল পরিচিত। ২০২১ সালের নির্বাচনে এখানে ২২টি আসনের মধ্যে ২০টিতেই জয় পেয়েছিল তৃণমূল। এবার তৃণমূলের আসন সংখ্যা নেমে এসেছে নয় আসনে। অন্যদিকে, এবার আট আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। অথচ গত নির্বাচনে বিজেপি পেয়েছিল মাত্র দুটি আসন। এসআইআরের ফলে শুধুমাত্র এই জেলাতেই প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিল।
যদিও তৃণমূলের দাবি, এসআইআরের ফলে তাদের ক্ষতি হয়েছে। তবে নির্বাচনী পরিসংখ্যান বলছে যে, কংগ্রেস, সিপিএম এবং এজেউপির মধ্যে সংখ্যালঘু ভোট বিভক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টিই তৃণমূলের ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রানিনগর কেন্দ্রে খুব সামান্য ব্যবধানে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছে কংগ্রেস। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছে সিপিএমও। এই দুই দলের সম্মিলিত মুসলিম ভোট আগে গিয়েছিল তৃণমূলের পক্ষেই। এবার তা হয়নি। অন্যদিকে, ডোমকল কেন্দ্রে সিপিএমের বিজয় আবার এই প্রশ্নও তুলে দিয়েছে যে, সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে মুসলিমদের একাংশ ফিরতে শুরু করেছে বামেদের দিকে। রেজিনগর এবং নওদা কেন্দ্রে এজেউপি প্রার্থী হুমায়ুন কবির তার স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন বিজয়। মুসলিম ভোটারদের থেকে বিপুল সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছেন তিনিও, যে ভোটগুলি তৃণমূল কংগ্রেসের ঝুলিতেই যেত। অন্যদিকে, কান্দি এবং নবগ্রামের মতো আসনগুলোতে হিন্দু ভোটারদের সমর্থনকে কাজে লাগিয়েছে বিজেপি। বিরোধী শিবির বিভক্ত থাকার সুযোগ নিয়ে তারা এমন সব আসনে জয়লাভ করেছে, যেখানে শুধুমাত্র বিজেপি ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াই হলে বিজেপির পক্ষে জয় পাওয়াটা ছিল বেশ কঠিন।
মালদায় বিজেপির আসন চার থেকে বেড়ে হয়েছে ছয়টি। এখানে মুসলিম ভোটে বিভাজন ও কংগ্রেসের নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির কারণে তৃণমূল অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। উত্তর দিনাজপুরও ঠিক একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছে। এখানে তাদের আসন সংখ্যা দ্বিগুণ করে দুই থেকে চারে নিয়ে গেছে বিজেপি। অন্যদিকে তৃণমূলের আসন সাত থেকে কমে নেমে এসেছে পাঁচে। একাধিক কেন্দ্রে কংগ্রেস ও বাম প্রার্থীদের সম্মিলিত ভোটের হার ছাড়িয়ে গেছে তৃণমূলের পরাজয়ের ব্যবধানকেও। এই তিনটি জেলার বাইরেও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং বীরভূমের কিছু অংশে দেখা গিয়েছে এমন প্রবণতা। এখানেও চোখে পড়ার মতো সাফল্য অর্জন করেছে বিজেপি। সংখ্যালঘু ভোট ভাগ মাইলেজ দিয়েছে দলটিকে



