দুর্নীতি ও অভিষেক প্রেমেই ডুবল মমতার তরী

ছবি: আনন্দবাজার
দীর্ঘ শাসনের পরও কেন নিশ্চিত পরাজয়ের পথে তৃণমূল— তার কারণ খুঁজতে গেলে পথের শেষে পাওয়া যাবে দুর্নীতিকে। সেই সঙ্গে পুরনো ও ত্যাগী কর্মীদের গুরুত্ব না দেওয়া, রাজ্যে বড় বিনিয়োগ আনতে না পারার মতো কারণ ‘দিদি’র পরাজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। ধূমকেতুর মতো দলে আসা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থানকেও দুষছেন কেউ কেউ।
এসবের মিলিত ফল হিসেবেই ১৫ বছর তৃণমূলের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলা দখলের মুখে বিজেপি। তাই সাংগঠনিক শক্তি থাকার পরও সাধারণ মানুষের পরিবর্তনমুখী চিন্তাভাবনার ফলেই পরাজয়ের মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল।
বাম সরকারের পতনের পর পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজ ভেবেছিল, বাংলায় শিল্পায়নের জোয়ার আসবে। ১৫ বছরের শাসনে শিল্পায়ন টানতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লন্ডন, স্পেন, জাপান, আমেরিকা সফর করলেও বিনিয়োগ আসেনি। রিলায়েন্স, টাটা, আদানি, হিন্দুজা, আদি গোদরেজ, বিড়লার মতো শিল্পগোষ্ঠী বাংলায় বড় বিনিয়োগ করেনি। বিনিয়োগ না হলে হয় না কর্মসংস্থানও। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তরুণদের একটি অংশ অনেক দিন ধরেই রুষ্ট ছিল মমতার সরকারের ওপর।
মমতাকে ডোবাচ্ছেন ভাতিজা!
০৪ মে ২০২৬
বাংলায় শিল্পায়ন না হওয়ায় হাজারো শ্রমিক ভিড় জমান বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয়, যেখানে তাদের ন্যূনতম মজুরিও পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে বেশি। কলকাতায় কোনো শ্রমিকের মজুরি ৫০০ টাকা হলে কেরল, কর্ণাটক, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানে পরিযায়ী শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮০০ টাকা। এই ফারাক থেকেও শ্রমিকদের একটা বড় অংশের ভোট গিয়েছে বিজেপির দিকে।
অন্যদিকে শিক্ষক নিয়োগ, মাদ্রাসায় নিয়োগ, পৌরসভার নিয়োগে দুর্নীতি নিয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ওপর রুষ্ট ছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা।
প্রচলিত ছিল, ১০-১২ লাখ টাকা দিলেই তৃণমূল আমলে চাকরি পাওয়া যায়। এসব অভিযোগের কারণে শিক্ষার্থীদের একাংশের ক্ষোভও ছিল সরকারের প্রতি। এ ছাড়া কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকার বিনিময়ে ভর্তির অভিযোগ ছিল অনেক তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে।
এসব সম্মিলিত ক্ষোভই প্রতিফলিত হয়েছে ব্যালট বাক্সে। বুথফেরত জরিপগুলো তাই এগিয়ে রাখছে বিজেপিকে।
অন্যদিকে, ক্ষমতায় আসার পর পুরনো ও ত্যাগী কর্মীদের গুরুত্ব কমতে থাকে। দলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান হলে জায়গা হারান অনেক আদি কর্মী।
বাম আমলে সরকারি কর্মচারীদের মমতার দিকে টেনেছিলেন মনোজ চক্রবর্তী। সরকারি কর্মচারীদের বর্ষীয়ান নেতা মনোজ চক্রবর্তীকে গুরুত্ব দেয়নি তৃণমূল। যার ফলে তৃণমূল সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে সংগঠন করতে ব্যর্থ হয়েছে। পরাজয়েরও বড় কারণ এই সরকারি কর্মচারীরা।
একপর্যায়ে আমডাঙার প্রাক্তন বিধায়ক রফিকুর রহমান, মালদার কৃষ্ণেন্দু চক্রবর্তী, সিঙুরের প্রাক্তন বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়রা কোণঠাসা হয়ে পড়লে দলে সৎ নেতার অভাব দেখা দেয়। বর্ষীয়ান বিধায়কের অনেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব মানতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তৃণমূল স্তরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা দলের দায়িত্ব পাওয়ায় সাংগঠনিক স্তরে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যায় তৃণমূল।
এসবের পাশাপাশি শুভেন্দু অধিকারীর উগ্র হিন্দুত্ববাদী ভাবাবেগকেও মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে তৃণমূল। সংখ্যালঘুদের সমর্থন থাকলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সংখ্যালঘু নেতাকেও সামনে তুলে ধরতে পারেনি তৃণমূল।
কফিনের শেষ পেরেকটি ছিল অবশ্যই আরজি কর-কাণ্ড। নির্ভয়ার ধর্ষণ-কাণ্ডের পর শহুরে শিক্ষিত নারী ভোটের একটা বড় অংশ চলে যায় বিজেপির দিকে। যার ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বপূর্ণ একজন নারী নেত্রীকেও বাংলা থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে।





