পশ্চিমবঙ্গে এবার আরেক দিদি?
- ফ্যাশন ডিজাইনার থেকে মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে অগ্নিমিত্রা

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে আলোচনায় অগ্নিমিত্রা। ছবি: সংগৃহীত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন নতুন হাওয়া। রাজ্যটির বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর পাল্টে গেছে রাজনীতির হিসাবনিকাশ আর সমীকরণ। রাজ্যটিতে একদিকে যেমন তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের শাসন অবসান হয়েছে, তেমনি প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ঠিক হয়েছে নতুন সরকারের শপথ নেওয়ার দিনক্ষণও। তবে এখনো চূড়ান্ত হয়নি কে হবেন রাজ্যের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী। বেশ কয়েকজনের নামই আলোচিত হচ্ছে রাজ্য সরকারের প্রধানের পদে।
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একসময়ের সিপাহসালার শুভেন্দু অধিকারীকে অনেকেই ভাবছেন রাজ্যের পরবর্তী সরকারপ্রধান হিসেবে। বিধানসভায় দীর্ঘদিন সামলেছেন বিরোধী দলনেতার পদ। বিজেপির রাজ্য শাখার সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকে মুখ্যমন্ত্রীর পদে দেখছেন কেউ কেউ।
তবে সমানতালে শোনা যাচ্ছে আরেকটি নাম, অগ্নিমিত্রা পাল। আসানসোল দক্ষিণের এ বিধায়ককে ঘিরে এরই মধ্যে তীব্র জল্পনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষ করে একজন নারী মুখকে সামনে রেখে বিজেপি নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে কি না, তা নিয়েও চলছে কানাঘুষা।
এবারের ভোটে আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে অগ্নিমিত্রা পাল জয়ী হয়েছেন বিপুল ভোটে। তৃণমূল প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের চেয়ে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন তিনি। এই বড় ব্যবধানে জয় তাকে নিয়ে এসেছে রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে।
অগ্নিমিত্রা পালের রাজনৈতিক জীবন তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও তার উত্থান হয়েছে খুব দ্রুত। ২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ছিলেন পেশাদার ফ্যাশন ডিজাইনার। কলকাতা তথা ভারতের ফ্যাশন জগতে তার নিজস্ব ব্র্যান্ড ‘INGA’ দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত ছিল। তিনি শ্রীদেবী, মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বলিউড তারকার পোশাক ডিজাইন করেছেন।
অগ্নিমিত্রার জন্ম ১৯৭৪ সালে আসানসোলে। বাবা ছিলেন চিকিৎসক এবং মা গৃহিণী। পড়াশোনা করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে ফ্যাশন ডিজাইনে নিয়েছেন ডিপ্লোমা ডিগ্রিও। ফ্যাশন দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়।
বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তিনি হয়ে ওঠেন সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি দলের নারী মোর্চার দায়িত্ব পান এবং রাজ্য জুড়ে নারী সংগঠন শক্তিশালী করতে কাজ করেন। পরে বিজেপির রাজ্য সহসভাপতির দায়িত্বও পান। রাজনীতিতে তার ভূমিকা মূলত সংগঠন শক্ত করা, নারী ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়তা বাড়ানোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় অগ্নিমিত্রা পাল শিল্পাঞ্চলের সমস্যা, কর্মসংস্থান এবং নারীর নিরাপত্তা নিয়ে ছিলেন সরব। এসব ঘটনার মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে পরিচিতি পান একজন লড়াকু মুখ হিসেবে।
তবে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী প্রায় ২৩টি মামলার উল্লেখ আছে, যার মধ্যে রয়েছে অবৈধ জমায়েত, দাঙ্গা লাগানো, সরকারি নির্দেশ অমান্য এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ-সংক্রান্ত অভিযোগ।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো— তার সাম্প্রতিক দিল্লি সফর। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি চার্টার্ড বিমানে দিল্লি গিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে করেন একান্ত বৈঠক। এক ঘণ্টা ধরে চলা ওই দলীয়ভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ বলা হলেও রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ বৈঠক শুধু শুভেচ্ছা সাক্ষাৎ নয়; বরং ভবিষ্যতে তাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে বিবেচনা করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অতীতে বিভিন্ন রাজ্যে নতুন মুখকে সামনে এনে চমক দিয়েছে। ফলে বাংলায়ও সে একই কৌশল প্রয়োগ হতে পারে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
অগ্নিমিত্রা পাল মুখ্যমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে আসার পেছনে কয়েকটি কারণও রয়েছে। প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন একজন নারী মুখ্যমন্ত্রী থাকায় রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারী মুখকে সামনে আনা বিজেপির জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, তার বিরুদ্ধে কোনো বড় ধরনের দুর্নীতির দাগ না থাকায় তাকে ‘স্বচ্ছ মুখ’ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। তৃতীয়ত, তিনি সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় এবং মাঠ পর্যায়ে কাজ করেছেন।
এ ছাড়া রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি যদি বাংলায় নতুন প্রশাসনিক মডেল তৈরি করতে চায়, তাহলে একজন তুলনামূলক নতুন ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মুখকে সামনে আনা তাদের কৌশলের অংশ হতে পারে। সেই জায়গায় অগ্নিমিত্রা পালের নাম প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী পদে শুভেন্দু অধিকারীর নামও আলোচিত হচ্ছে সমানভাবে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং সংগঠনের মধ্যে শক্ত অবস্থান রয়েছে তার। ফলে বিজেপির অভ্যন্তরে এ সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন্দল দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও আছে। যদিও প্রকাশ্যে কোনো বিরোধ দেখা যায়নি। তবুও শঙ্কাটিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
এদিকে, আগামী ৯ মে নতুন সরকারের শপথগ্রহণ হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ছে। দিল্লি সফরের পর কলকাতায় ফিরে অগ্নিমিত্রা পাল সাংবাদিকদের প্রশ্নে বললেন, দল যে দায়িত্ব দেবে, তিনি তা পালন করতে প্রস্তুত। এই একটি বাক্যই তার ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে অগ্নিমিত্রা পাল এখন শুধু একজন বিধায়ক নন; বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী মুখ হিসেবে উঠে এসেছেন। ফ্যাশনদুনিয়া থেকে রাজনীতির শীর্ষ স্তরে তার এ যাত্রা যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। তবে শেষ পর্যন্ত কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, তা নির্ভর করছে বিজেপির দলীয় নেতৃত্বের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। আপাতত দিল্লির রাজনৈতিক বার্তা, রাজ্যের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং নেতৃত্বের কৌশল— সবমিলিয়েই ঠিক হবে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রীর নাম।



