বিধানসভা নির্বাচন
দেড় দশক পর পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের সুর
- বিজেপি এগিয়ে ২০৪ আসনে, তৃণমূল ৮৩টিতে

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সমর্থক শিবিরে উল্লাস। ছবি: আনন্দবাজার
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট নেওয়া হয় দুই দফায়। এবার চলছে গণনা। কর্মযজ্ঞ যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা। সকাল ৮টায় শুরু হওয়া ভোটগণনার ধারায় বেলা ৩টা পর্যন্ত যে ফল পাওয়া গেছে, তা দিচ্ছে রাজ্যের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণের আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি এগিয়ে ২০৪ আসনে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস ৮৩টিতে। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস এবং অন্যরা ছয়টিতে এগিয়ে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দিচ্ছে— ক্ষমতার পালাবদল এখন সময়ের ব্যাপার।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলার মসনদ দখলে রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের। এবার কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়েছে দলটি। ভোটবাক্সে সাধারণ মানুষের রায়ের যে প্রতিফলন এখন ধরা পড়ছে, তা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার কথাই বলছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে শহর ও কলকাতাসংলগ্ন অঞ্চলে বিজেপির অগ্রগতি এই পরিবর্তনের বার্তাকে করছে আরও স্পষ্ট।
কলকাতার রাজনৈতিক মানচিত্রে এবারের গণনায় দেখা যাচ্ছে নতুন রঙ। পানিহাটি, মানিকতলা, বরাহনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে এগিয়ে বিজেপির প্রার্থীরা। পানিহাটিতে আরজি কর হাসপাতালে নির্যাতনের শিকার মেয়েটির মা হিসেবে পরিচিত বিজেপির প্রার্থী এগিয়ে থাকায় ইস্যুভিত্তিক ভোটের প্রভাব নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। মানিকতলায় বিজেপির তাপস রায় এগিয়ে, বরাহনগরে সজল ঘোষ পেছনে ফেলেছেন তৃণমূলের সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
তবে লড়াই একতরফা নয়। তৃণমূল কংগ্রেসও একাধিক কেন্দ্রে ধরে রেখেছে নিজেদের শক্তি। বালিগঞ্জে শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে। বেলেঘাটা, উলুবেড়িয়া পূর্ব, হিঙ্গলগঞ্জ ও করিমপুরের মতো কেন্দ্রে নিজেদের অবস্থান বজায় রেখেছেন তৃণমূল প্রার্থীরা। ফলে সামগ্রিকভাবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও, লড়াই এখনো বহুমাত্রিক।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো তৃণমূলের একাধিক হেভিওয়েট নেতার পিছিয়ে পড়া। শশী পাঁজা, ব্রাত্য বসু, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, সুজিত বসু, মানস ভুঁইয়াসহ অন্তত ২৩ মন্ত্রী পিছিয়ে রয়েছেন নিজেদের কেন্দ্রে।
জেলা স্তরেও একই ছবি। কোচবিহারের ৯টি আসনেই এগিয়ে বিজেপির প্রার্থীরা। রানাঘাট উত্তর-পশ্চিমে বিজেপির পার্থসারথি চট্টোপাধ্যায় বড় ব্যবধানে রয়েছেন এগিয়ে। বড়ঞা, উত্তরপাড়া, খড়গ্রামের মতো কেন্দ্রেও বিজেপির শক্তি স্পষ্ট। খড়গ্রামে বিজেপির মিতালি মাল এরই মধ্যে নিশ্চিত করেছেন জয়। কান্দিতে বিজেপির গার্গী ঘোষ দাস তৃণমূলের অপূর্ব সরকারকে পরাজিত করেছেন উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে। ফলগুলো মিলিয়ে যে চিত্র উঠে আসছে তা হলো, শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই বিজেপি তাদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম।
বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজনা
গণনার দিন শুধু সংখ্যার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন জায়গায় সামনে এসেছে উত্তেজনার ঘটনাও। কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের সামনে তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে হয়েছে সংঘর্ষ। অভিযোগ রয়েছে ভাঙচুরের। তৃণমূলের পার্টি অফিসে ভাঙচুরের অভিযোগ সামনে এসেছে কল্যাণীতেও। ঘটনাগুলো গণনার আবহে বাড়িয়েছে উদ্বেগ।
এদিকে ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল হয়ে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন সেখানে নির্দেশ দিয়েছে পুনর্নির্বাচনের। ফলে পরে গণনা হবে সেই আসনের ফল।
সব মিলিয়ে বেলা ৩টা পর্যন্ত যে চিত্র সামনে এসেছে, তা বাংলার রাজনীতিতে সম্ভাব্য নতুন ইঙ্গিত দেয় যুগান্তরের। বিজেপি এই লিড বজায় রাখতে পারলে প্রথমবারের মতো করবে রাজ্যে সরকার গঠন।
নবান্নে নজিরবিহীন নিরাপত্তা
ক্রমেই উত্তেজনা বাড়তে থাকায় রাজ্যের প্রশাসনিক স্তরে বাড়ছে সতর্কতা। সম্ভাব্য ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে রাজ্যের প্রশাসনিক সদর দপ্তর নবান্নে জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতি কেড়েছে নজর।
নবান্নের সব প্রবেশ ও প্রস্থানপথে চলছে কড়া নজরদারি। দপ্তরে ঢোকা বা বেরোনো সব কর্মীকে যেতে হচ্ছে তল্লাশির মধ্য দিয়ে। প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি বা ফাইল যাতে বাইরে নিয়ে যাওয়া বা ভেতরে আনা না যায়, সে লক্ষ্যেই এ বিশেষ ব্যবস্থা। একই সঙ্গে রাজ্যের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরেও বাড়ানো হয়েছে সতর্কতা।
নবান্নে কর্মরত একাধিক কর্মী জানিয়েছেন, এদিন দপ্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে অনেকটাই কঠোর হয়েছে নিয়ম। খতিয়ে দেখা হচ্ছে ব্যক্তিগত ব্যাগ থেকে শুরু করে ফাইল— সবই। যদিও এই নজরদারি হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে, তবুও পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় সহযোগিতা করছেন কর্মীরা।
সব মিলিয়ে একদিকে ভোটের ফলাফলে সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত, অন্যদিকে প্রশাসনিক স্তরে কড়া নজরদারি— এই দুই মিলিয়ে রাজ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি। এখন চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষা, যা নির্ধারণ করবে আগামী দিনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দিশা।





