এআই ব্যবহারে যৌক্তিক চিন্তার ক্ষমতা কমছে যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থীদের : জরিপ

সংগৃহীত ছবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের ফলে ইংল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা যৌক্তিক চিন্তার সক্ষমতা হারাচ্ছে বলে মনে করছেন দেশটির মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা। ন্যাশনাল এডুকেশন ইউনিয়নের (এনইইউ) প্রকাশিত এক জরিপে উঠে এসেছে এ চিত্র।
ইংল্যান্ডের সরকারি স্কুলের ৯ হাজারের বেশি শিক্ষকের মতামতের ভিত্তিতে করা ওই জরিপে দেখা গেছে, মাধ্যমিক পর্যায়ের ৬৬ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন, এআই ব্যবহারের ফলে সমালোচনামূলক চিন্তার দক্ষতা কমেছে শিক্ষার্থীদের। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকদের মধ্যে এ মতের হার ২৮ শতাংশ।
শিক্ষকদের ভাষ্য, এআই ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। কেউ কেউ বলছেন, ভয়েস-টু-টেক্সট প্রযুক্তির কারণে বানান শেখার প্রয়োজনও অনুভব করছে না অনেক শিশু।
এনইইউর জরিপে এক শিক্ষক বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীরা মৌলিক দক্ষতা হারাচ্ছে, চিন্তা করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, লেখার অভ্যাস, এমনকি কীভাবে কথোপকথন করতে হয়, সেটাও।’
আরেক শিক্ষকের ভাষ্য, ‘সমস্যা সমাধান, যৌক্তিক চিন্তা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা, অর্থাৎ শেখা বলতে যা বোঝায়, এআই সেটাই ধ্বংস করে দিচ্ছে।’
‘ভয়েস-টু-টেক্সট প্রযুক্তি জ্ঞানের জায়গা নিয়ে নেওয়ায় আর বানান শেখার প্রয়োজন বোধ করছে না শিশুরা,’ বলেছেন আরেকজন শিক্ষক।
এমন পরিস্থিতিতেই স্কুলে তথাকথিত ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে যুক্তরাজ্য সরকার। জানুয়ারিতে সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা এমন এআই টিউটরিং টুল তৈরি করতে চায়, যা এককভাবে ৪ লাখ ৫০ হাজার পর্যন্ত সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীকে শেখার সহায়তা দিতে পারবে।
তখন শিক্ষামন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসন বলেছিলেন, ‘তরুণদের জন্য প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ বদলে দিতে পারে এআই টিউটরিং টুল। এখন যা কেবল ভাগ্যবান অল্প কয়েকজনের নাগালে, তা প্রত্যেক প্রয়োজনীয় শিশুর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে, যাতে সফল ও বিকশিত হতে পারে সব শিশু।’
তবে এই পরিকল্পনা নিয়ে শিক্ষকসমাজে গভীর সংশয় রয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, সরকারের এআই টিউটর পরিকল্পনার বিপক্ষে মত দিয়েছেন ৪৯ শতাংশ শিক্ষক। আর সমর্থন জানিয়েছেন মাত্র ১৪ শতাংশ।
অনেক শিক্ষকের মতে, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কখনোই মানবশিক্ষক বা টিউটরের ভূমিকার বিকল্প হতে পারবে না এআই। কারণ একাডেমিক সহায়তার পাশাপাশি মানসিক ও সামাজিক সহায়তাও দরকার হয় শিশুদের।
একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘যেসব শিক্ষার্থীর টিউটর দরকার, তাদের অনেকেরই শুধু একাডেমিক সহায়তা নয়, আরও অনেক কিছু প্রয়োজন হয়। তা দিতে পারবে না এআই।’ আরেকজনের ভাষ্য, ‘শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতে পারবে না এআই টিউটর।’
‘সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের টিউটরিংয়ে এআই-এর বদলে মানুষের সংস্পর্শ দরকার, যাতে তাদের সামাজিক দক্ষতা বাড়ে এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কমে,’- বলেছেন আরেকজন শিক্ষক।
জরিপে আরও দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারে উদ্বেগ থাকলেও কাজের ক্ষেত্রে ক্রমেই বেশি এআই ব্যবহার করছেন শিক্ষকরা।
৭৬ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, বর্তমানে নিয়মিত এআই ব্যবহার করেন তারা। এক বছর আগে এ হার ছিল ৫৩ শতাংশ। তাঁদের মধ্যে ৬১ শতাংশ পাঠদানের উপকরণ তৈরি করতে, ৪১ শতাংশ পাঠপরিকল্পনা করতে এবং ৩৮ শতাংশ এআই ব্যবহার করেন প্রশাসনিক কাজে। খাতা মূল্যায়নে এআই ব্যবহার করেন মাত্র ৭ শতাংশ শিক্ষক।
তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়মকানুন নির্ধারণে পিছিয়ে আছে অনেক স্কুল। ৪৯ শতাংশ শিক্ষক জানিয়েছেন, তাঁদের স্কুলে শিক্ষক বা শিক্ষার্থীদের এআই ব্যবহারের বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। আর প্রায় ৬৬ শতাংশ বলেছেন, শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো নীতিমালাই নেই।
একজন শিক্ষক বলেছেন, ‘কর্মীদের সঠিকভাবে এআই ব্যবহারের প্রশিক্ষণ নেই, কিন্তু তারা ব্যবহার করছে এবং এতে তৈরি হচ্ছে নিম্নমানের জঞ্জাল।’
আরেক শিক্ষক বলেছেন, ‘সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে শিক্ষাক্ষেত্রে মূল্যবান উপকরণ হতে পারে এআই। কিন্তু তার জন্য নিয়ন্ত্রণ, দিকনির্দেশনা, প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য নীতিমালা থাকা দরকার।’
এনইইউর সাধারণ সম্পাদক ড্যানিয়েল কেবেদে বলেছেন, জরিপের ফলাফল দেখাচ্ছে যে, এআইয়ের ওপর বাড়তে থাকা নির্ভরতা প্রভাবিত করছে শিক্ষার্থীদের মৌলিক শেখার দক্ষতাকে।
তার ভাষ্য, ‘শিক্ষার্থীদের অবশ্যই নিজেদের চিন্তা করার ক্ষমতা থাকতে হবে। শেখার মূল বিষয়ই এটি। কিন্তু আমাদের জরিপ দেখাচ্ছে, এআই-এর ওপর নির্ভরতা প্রভাব ফেলছে তাদের সমালোচনামূলক চিন্তার সক্ষমতায়।’
‘সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের সুযোগের ব্যবধান কমাতে এআই টিউটর কোনো ম্যাজিক বুলেট, এমনটা শিক্ষকসমাজ মোটেই মনে করছে না। এর প্রভাব ভালোভাবে বোঝার আগেই এআই টিউটর চালু করে ঝুঁকি নিচ্ছে সরকার,’ যোগ করেন তিনি।
অবশ্য এ নীতির পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছেন সরকারের এক মুখপাত্র। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে পারিবারিক বা সামাজিক পটভূমি আর সাফল্যের মধ্যে যে সম্পর্ক, তা ভেঙে দেওয়া। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সহায়তা করতে পারে এআই টিউটরিং টুল। বর্তমানে যে প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা কেবল সুবিধাভোগী অল্প কয়েকজনের জন্য পাওয়া যায়, তা প্রত্যেক প্রয়োজনীয় শিশুর কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে এর মাধ্যমে।’
তার ভাষ্য, ‘কোনো প্রযুক্তিই মৌলিক জ্ঞান ও শৃঙ্খলাবদ্ধ চিন্তার ভিত্তিকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না, যা শিক্ষার্থীদের পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করে। তবে ডিজিটালনির্ভর বিশ্বের জন্যও প্রস্তুত করতে হবে শিশুদের। সে কারণেই আমাদের স্কুলবিষয়ক শ্বেতপত্রে এআই যাতে নিরাপদ, সমালোচনামূলক ও দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার করা হয়, তার একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে, যাতে সফল ও বিকশিত হতে পারে প্রতিটি তরুণ।’
এনইইউ জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে করা হয়েছে জরিপটি। এতে উঠে এসেছে স্কুলে এআই-এর দ্রুত বিস্তার, নীতিমালা, তদারকি ও প্রশিক্ষণের ঘাটতির বিষয়টি।

