জীবন বাঁচাতে সোনার খোঁজে আফগানরা

পুরুষরা কুনার নদীর তীরের কাছে পাহাড়ের ঢাল খুঁড়ে, তারপর সেই পাথরগুলো ছেঁকে সোনার ছোট দানা খোঁজে। ছবি: সংগৃহীত
আফগানিস্তানের বর্তমান টালমাটাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে কর্মসংস্থানের অভাব আর ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্যের চাপে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ এখন বেছে নিচ্ছেন চরম অনিশ্চয়তার পথ।
তেমনই এক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় কুনার প্রদেশের কুনার নদীর অববাহিকায়। যেখানে শত শত মানুষ তাদের পূর্বের পেশা ছেড়ে এখন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন কেবল কয়েক ফোঁটা স্বর্ণের কণার আশায়।
কাবুল থেকে প্রায় সাত ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে কুনার নদীর তীরে এসেছেন ৪৫ বছর বয়সী দেলোয়ার। আট সন্তানের এই বাবা আগে কাজ করতেন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সে কাজ হারিয়েছেন অনেক আগেই।
আক্ষেপের সুরে দেলোয়ার জানান, দেশে নেই কোনো কাজের সুযোগ। পরিবার তো বাঁচাতে হবে! তাই আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য ব্যবস্থা করেছি এই কাজের।
হিন্দু কুশ পর্বতমালার পাদদেশে হাড়কাঁপানো শীত আর পাথুরে নদীর রুক্ষতা উপেক্ষা করে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে এই কর্মযজ্ঞ।
তাদের কাজের ধরণ অত্যন্ত আদিম। প্রথমে নদীর তীরের শুকনো মাটি আর পাথর খুঁড়ে তুলে আনা হয়, এরপর তা ধুয়ে ফেলা হয় নদীর প্রবাহমান পানিতে।
দেলোয়ার বলেছেন, তারা সারাদিন খেটে যে স্বর্ণের দানা পান, তা আকারে একটা গমের দানার চেয়েও ছোট। তবুও এই ছোট দানাগুলোই এখন তাদের পরিবারের মুখে তুলে দিচ্ছে অন্ন।
আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষের গড় মজুরি অত্যন্ত কম। সেই তুলনায় এই কাজকে বেশ লাভজনক মনে করছেন ৩৫ বছর বয়সী গুল আহমদ জানের মতো অনেকেই। তিনি জানান, কঠোর পরিশ্রম করলে এক সপ্তাহে প্রায় ১ গ্রামের মতো স্বর্ণ সংগ্রহ করা সম্ভব। স্থানীয় বাজারে যার মূল্য প্রায় ৮ হাজার আফগানি (প্রায় ১২৫ ডলার)।
আফগানিস্তানের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক সপ্তাহে এই পরিমাণ টাকা আয় করা সাধারণ মানুষের জন্য বড় প্রাপ্তি।
কয়েক দশকের যুদ্ধ আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় আফগানিস্তানের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ আটকা পড়ে আছে খনিতেই। বড় কোনো শিল্পায়ন না হওয়ায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে হাত দিয়ে স্বর্ণ তোলার এই আদিম পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
কুনার প্রদেশের স্থানীয় কর্মকর্তারা বলছেন, গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে মানুষ স্বর্ণ খুঁজছে, তবে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ধসের পর এই কাজে মানুষের ঢল অনেক বেড়েছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর প্রতিদিনের ক্ষুধার কাছে পরাজিত হয়ে এই মানুষগুলো এখন নিজেদের ভাগ্য খুঁজে বেড়াচ্ছেন কুনার নদীর বালু আর পাথরের মধ্যেই।
দিনশেষে তাদের প্রাপ্তি হয়তো অতি সামান্য কিছু স্বর্ণের কণা, কিন্তু তা-ই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছে এক ধ্বংসপ্রায় অর্থনীতির মাঝে।
সূত্রঃ আলজাজিরা







