দ্য ইকোনোমিস্টের প্রতিবেদন
পুতিনের হাত ফসকে যাচ্ছে ‘রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ’

সংগৃহীত ছবি
ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়াকে এমন এক পথের শেষে নিয়ে গেছেন, যেখান থেকে সামনে কী আছে তার কোনো মানচিত্র নেই কারও হাতেই। এমনই এক ধরনের উপলব্ধিই ছড়িয়ে পড়েছে রাশিয়াজুড়ে।
দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, আঞ্চলিক গভর্নর এবং ব্যবসায়ীদের ভাষায় এসেছে পরিবর্তন। তারা দেশের কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলার সময় ‘আমরা’ এবং ‘আমাদের’ ব্যবহার করছেন না। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের যুদ্ধ হয়তো বেপরোয়া এবং ব্যর্থতার দিকে, কিন্তু সেটি ছিল সবার ভাগাভাগি করা বাস্তবতা। তবে এখন তারা যা ঘটছে, সেটিকে ‘তার’ গল্প হিসেবে বর্ণনা করছেন, ‘আমাদের’ নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ এখন আর সবার সমন্বিত কোনো প্রকল্প নয়, বরং এটি কেবলই পুতিনের ব্যক্তিগত এজেন্ডা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এমনকি পুতিনের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তকে ‘অদ্ভুত’ হিসেবেও বর্ণনা করা হচ্ছে। যদিও ভাষার এই পরিবর্তনকে বিদ্রোহের ইঙ্গিত বলা যায় না। কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা ভয়, জড়তা ও দমন-পীড়নের ওপর দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে। এখনো রাষ্ট্রের হাতে সহিংসতার একচেটিয়া ক্ষমতা রয়েছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একচেটিয়া ক্ষমতা।
পুতিন যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ক্ষমতা ও নিজের তৈরি ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে। এখন সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো, রুশরা তাকে ছাড়া ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শুরু করেছে। এর পেছনে একত্রে কাজ করছে চারটি কারণ।
অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের ক্ষোভ
ইউক্রেন যুদ্ধকে এমন এক বিশেষ সামরিক অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠী পরিচালনা করবে এবং তারা এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা পাবে, আর বাকি সমাজ স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাবে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মডেল ভেঙে পড়ে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি ও কর বেড়েছে, অবকাঠামো অবহেলিত হয়েছে, সেন্সরশিপ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞার শেষ নেই। এটি জাতীয় যুদ্ধ নয়, কিন্তু এর মূল্য গোটা জাতিকেই দিতে হচ্ছে—আর বিনিময়ে সমাজকে কোনো লক্ষ্যও দেওয়া হচ্ছে না।
অভিজাত মহলের টানাপোড়েন
অভিজাতদের মধ্যে নিয়মের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা নিজেদের পুঁজি নিয়ে আবার রাশিয়ায় ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। আগে তাদের সম্পত্তির অধিকার পশ্চিমা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। তারা লন্ডনের আদালত, অফশোর কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সালিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিরোধ মেটাতেন বা সুরক্ষা চাইতেন। এখন বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হচ্ছে দেশীয়ভাবে, কার্যকর প্রতিষ্ঠান ছাড়াই। সম্পদের পুনর্বণ্টন যত বাড়ছে, তত জরুরি হয়ে উঠছে নিয়মের প্রয়োজন।
গত তিন বছরে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন রুবল (৬০ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের সম্পদ ব্যক্তিমালিকদের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছে অথবা অনুগত ব্যক্তি ও ঘনিষ্ঠদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এটি ১৯৯০-এর দশকের ব্যাপক বেসরকারিকরণের পর সবচেয়ে বড় সম্পদ পুনর্বণ্টন। এমন নয় যে অভিজাতরা হঠাৎ আইনের শাসন বা গণতন্ত্রের প্রতি অনুরাগী হয়ে উঠেছেন। কিন্তু শাসনব্যবস্থার অনুগতরাও এমন নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান চান, যা ন্যায়সংগতভাবে বিরোধ মেটাতে পারে।
পরিচয়গত অনিশ্চয়তা
রাশিয়া নিজেকে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের শক্তি হিসেবে দেখে। বাস্তবে এটি কেবল একটি প্রভাবক, যা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ পশ্চিমা গণতন্ত্রের সংকট, জনতাবাদের উত্থান এবং বিশ্বায়নবিরোধী মনোভাবকে ত্বরান্বিত করেছে। এখন রাশিয়া এমন এক বিশ্বে রয়েছে যেখানে নিয়ম দুর্বল এবং অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত শক্তি ও খোলামেলা বলপ্রয়োগই প্রাধান্য পায়। নিয়মভিত্তিক বিশ্বে রাশিয়া অসমতাগুলোকে সুযোগ হিসেবে নিতে পারত, যেমন ইউরোপের গ্যাসনির্ভরতা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে তাদের আসন, সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক উত্তরাধিকার। কিন্তু এখন ইউরোপ অন্য জায়গা থেকে গ্যাস কিনছে, জাতিসংঘের দুর্বলতার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদে রাশিয়ার অবস্থানও গুরুত্ব হারিয়েছে, আর পারমাণবিক হুমকি দিয়ে তারা নিজেরাই নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে, ফলে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের মর্যাদাও হারিয়েছে। যখন পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়তে শুরু করে, তখন পুতিনবাদী সংশোধনবাদের সুবিধাগুলো দ্রুত মিলিয়ে যায়।
একই সময়ে রাশিয়া পরিচয় সংকটে ভুগছে। বহু প্রজন্মের মধ্যে এই প্রথম দেশটির নিজের পরিচয় নির্ধারণের জন্য কোনো বহিরাগত মডেল নেই। ঐতিহাসিকভাবে তারা নিজেদের ইউরোপ ও বৃহত্তর পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় সংজ্ঞায়িত করত। কখনো তাদের ধরার চেষ্টা করেছে, কখনো পিছিয়ে পড়েছে, কখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। সেই পুরোনো অক্ষ এখন ভেঙে গেছে। পশ্চিমা বিশ্ব একটি একক সাংস্কৃতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে সংকটে রয়েছে। এটি আদর্শগত সমস্যা নয়, কাঠামোগত। রাশিয়ার যেকোনো উন্নয়নের জন্য এখন অভ্যন্তরীণ অর্থবোধ প্রয়োজন—এবং সরকার তা দিতে অক্ষম।
আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ
রাশিয়া নাগরিকদের আদর্শিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু এর বিপরীতে কোনো সুবিধা নেই। আগের সামাজিক চুক্তি—যেখানে রাষ্ট্র মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করত না এবং নাগরিকরাও রাজনীতি থেকে দূরে থাকত—ভেঙে পড়েছে। আগে এই ব্যবস্থা সুবিধা, সেবা ও ভোগের সুযোগ দিয়ে মানুষের আনুগত্য কিনত। এখন তারা দিতে পারে শুধু দমন-পীড়ন, হস্তক্ষেপ ও সেন্সরশিপ—যার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ এ বছরের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ।
সমস্যা শুধু দমন-পীড়ন নয়, বরং উদ্দেশ্যহীন দমন-পীড়ন। কোনো আদর্শিক ব্যবস্থাই ভবিষ্যতের একটি চিত্র ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। এই ব্যবস্থা মানুষকে শৃঙ্খলা মানতে বলছে, কিন্তু কোনো ভবিষ্যৎ দেখাচ্ছে না। আনুগত্য দাবি করা হচ্ছে, কিন্তু সেই আনুগত্য কোন ভবিষ্যতের জন্য, তা বলা হচ্ছে না। এমনকি এই রাজনৈতিক বাস্তবতা সেই প্রযুক্তিবিদদের কাছেও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে না, যারা এটি নির্মাণে জড়িত। আশাবাদ নিঃশেষ হয়ে গেছে ভেতর থেকেই।
চাল ফুরিয়ে আসছে
এই চারটি কারণ মিলিয়ে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা দাবা খেলায় ‘জুগজভাং’ নামে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি চালই অবস্থাকে আরও খারাপ করে। পুতিন ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে। কিন্তু এটি রক্ষা ও সম্প্রসারণের জন্য তার প্রতিটি পদক্ষেপই অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। তার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে আরও দমন-পীড়ন বাড়ানো। তিনি হয়তো আরেকটি যুদ্ধও শুরু করতে পারেন।
কিন্তু এসব পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও খারাপই করবে। তিনি ক্ষমতা ও ভবিষ্যতের মধ্যকার সংযোগ আর ফিরিয়ে আনতে পারবেন না। তিনি কেবল আরও রক্তাক্ত ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারেন বিচ্ছিন্নতাকে।




