ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র নাকি অস্তিত্ব

সংগৃহীত ছবি
ইরান এখন আর ভূখণ্ডের জন্য লড়ছে না, তারা লড়ছে সময়ের বিরুদ্ধে। আর সময় যেন তাদের পক্ষে নেই। যুদ্ধবিরতি সাময়িকভাবে গোলাগুলির শব্দ থামালেও তেহরানের সামনে উন্মোচিত হয়েছে আরও ভয়াবহ এক যুদ্ধক্ষেত্র, তা হলো অর্থনীতি। বড় বড় বক্তৃতা বা প্রতীকী পদক্ষেপে এই সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এই ময়দানে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।
যুদ্ধ চলাকালীন এবং যুদ্ধবিরতির পরও ইরান প্রধান দরকষাকষির অস্ত্র হিসেবে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে চেয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, এই নৌপথ বন্ধ করে দিলে বিশ্ব অর্থনীতি কেঁপে উঠবে, তেলের দাম বাড়বে, আর পশ্চিমা বিশ্ব ছাড় দিতে বাধ্য হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যাচ্ছে সেই ধারণা। শক্তির বদলে হরমুজ এখন তাদের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে।
টিকে থাকার কৌশল
ইরানের লক্ষ্য এখন স্পষ্ট— হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পাওয়া এবং পারমাণবিক ইস্যু আপাতত সরিয়ে রাখা। অর্থাৎ, তারা আগে অর্থনৈতিক অক্সিজেন চাইছে, পরে কৌশলগত প্রশ্নে ফিরতে চাচ্ছে। এটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রের আচরণ নয়, বরং এমন এক শাসকগোষ্ঠীর ভঙ্গি যারা বুঝে গেছে সময় তাদের বিপক্ষে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ চাপ সহ্য করতে পারে। তাদের রয়েছে অর্থনৈতিক গভীরতা, বৈশ্বিক আর্থিক প্রভাব, বিকল্প জ্বালানি এবং শক্তিশালী নৌবাহিনী। বিপরীতে ইরান নির্ভরশীল বৈদেশিক আয়, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও তেল রপ্তানির ওপর। নিষেধাজ্ঞা শুধু আয় কমাচ্ছে না, বরং সময়, বিশ্বাসযোগ্যতা ও কৌশলগত নমনীয়তাও ক্ষয় করছে।
জ্বালানি বাজারে স্থায়ী ক্ষতি
চাপ যত বাড়ছে, ততই বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে তেহরান। যারা আগে ইরানের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা বিকল্প খুঁজে নিচ্ছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ইরানকে বাদ দিয়েই নতুন পথ তৈরি করছে। হারানো বাজার ফেরত পাওয়া সহজ নয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করতে দরকার সচল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রা, স্থিতিশীল রপ্তানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে পুনঃঅংশগ্রহণ, যা ইরানের হাতে নেই।
ইরানের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হলো যুদ্ধ বা বড় কোনো চুক্তি নয়, বরং মাঝামাঝি ‘ধূসর এলাকা’। এতে যুক্তরাষ্ট্র চাপ বজায় রাখতে পারে, কিন্তু বড় কোনো খরচ বহন করতে হয় না। ইরানের জন্য এটি ধীরে ধীরে শ্বাসরোধের মতো। হরমুজ প্রণালিতে যত বেশি অস্থিরতা তৈরি করছে তারা, বিশ্ব ততই তাদের বিরুদ্ধে একজোট হচ্ছে।
পারমাণবিক সংকটই মূল
সব সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে পারমাণবিক ইস্যু। ইরানের কাছে ইউরেনিয়াম মজুদ সার্বভৌমত্ব ও শক্তির প্রতীক। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সেটিই মূল সমস্যা। অর্থবহ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চাইলে ইরানকে পারমাণবিক বিষয়ে ছাড় দিতেই হবে।
ইরান আলোচনায় দেরি করতে পারে, মধ্যস্থতাকারী আনতে পারে। কিন্তু সময় তাদের পক্ষে নেই। অপেক্ষা করতেও সম্পদ লাগে। আর সেই সম্পদ তারা হারাচ্ছে। প্রশ্নটা এখন আর চুক্তি চাই কি না, তা নয়, বরং তারা কোনো ছাড় না দিয়েই চুক্তি করতে পারবে কি না, এটাই সন্দেহ।
ইরান একই সঙ্গে অর্থনৈতিক মুক্তি, পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক বাজারে ফেরা এবং পারমাণবিক ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে না। তারা এখন আটকে আছে দুই ভয়ের মাঝে— অর্থনৈতিক ধস ও অপমান। প্রতিদিন অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা, অথবা পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা— দুটির একটি বেছে নেওয়ার সময় এসেছে তেহরানের। দিন শেষে এই সিদ্ধান্তটি আর মতাদর্শের লড়াই থাকবে না, বরং এটি হবে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
লেখক: মাসাদ হারেৎজ ইনস্টিটিউটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা



