ইয়েমেনের ডিজিটাল জীবনের চালিকাশক্তি ‘স্টারলিংক’

মুকাল্লা ক্রিয়েটিভ হাবে কাজ করছেন ইয়েমেনি। ছবি: সংগৃহীত
হুথিদের কড়া নজরদারি ও আকাশচুম্বি দাম সত্ত্বেও ইয়েমেনের ডিজিটাল জীবনের চালিকাশক্তি এখন স্টারলিংক।
মুকাল্লা ক্রিয়েটিভ হাবে প্রতিদিন ভীড় জমান শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার ও নানা পেশার মানুষ। কারণ এখানে পাওয়া যায় দুর্লভ ও নির্ভরযোগ্য স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট। এই সংযোগটি ব্যবহার করেই প্রয়োজনীয় কাজ সারেন তারা।
হাবটি এখন পরিণত হয়েছে যৌথ কর্মস্থলে। প্রতিদিনের দৃশ্য কিছুটা এরকম— কালো টি-শার্ট পরা এক ব্যক্তি ডেস্কের উপর ঝুঁকে সহকর্মীর প্রজেক্টে সাহায্য করছেন, অন্যদিকে কয়েকজন তাদের ল্যাপটপ স্ক্রিনে আছেন তাকিয়ে। কাছেই কিছু নারী চেয়ারে বসে লিখছেন বা ফোনে স্ক্রল করছেন।
ইয়েমেনের উপকূলীয় শহর মুকাল্লার এই জায়গার অপর প্রান্তে প্রবেশপথে রয়েছে আধুনিক ক্যাফে-স্টাইল কাউন্টার, আর রঙিন আর্মচেয়ারগুলোতে বসে কয়েকজন মানুষ সারি সারি কম্পিউটারের মধ্যে কাজ করছেন।
ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সার হামজা বাখদার কাজ করেন এই হাবে। তিনি বলেছেন, ‘চারটি স্টারলিংক ডিভাইসের মাধ্যমে চলে এই হাবটি। এখানে ১০০-১৫০ এমবিপিএস গতিতে ইন্টারনেট সরবরাহ করা হয়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ভেঙে পড়েছে টেলিকমিউনিকেশন। বেতন কমে গেছে এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে দূরবর্তী অঞ্চলগুলো। সেখানেই ডিজাইনার, ডেভেলপার, শিক্ষক ও ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে একটি ছোট ডিজিটাল কর্মশক্তি তৈরি করছে স্টারলিংক। তারা এখন বিদেশি ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করতে পারছেন এবং আয় করছেন স্থানীয়দের তুলনায় অনেক বেশি।
ইয়েমেনে ইন্টারনেট অ্যাক্সেসকে অস্ত্র হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। মাটির নিচে থাকা ক্যাবলগুলো কখনও কখনও কেটে দেওয়া হয়, ফলে হঠাৎ করে দেশের কিছু অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণে থাকা হুতিরাই দেখভাল করে দেশটিতে ইন্টারনেট সেবা সরবরাহের বিষয়টি। ফলে নিজেদের বিরুদ্ধে যেকোনো ওয়েবসাইট তারা ব্লক করতে পারে। যার কারণে সবসময় ভয়ে থাকতে হয় প্রান্তিক পর্যায়ের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের।
স্টারলিংক ইয়েমেনে হুতিদের নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটানোর সুযোগ করে দিয়েছে, এমনকি দূরবর্তী এলাকাতেও মানুষকে সাহায্য করছে অনলাইনে থাকতে।
ভিডিও এডিটর ও মোশন গ্রাফিক্স ডিজাইনার মোহাম্মদ হেলমি ইয়েমেন, সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন ক্লায়েন্টের প্রজেক্ট সামলাচ্ছিলেন। দ্রুত ইন্টারনেটের কারণে তিনি আর ডেডলাইন মিস করার ভয় পান না, যা আগে তার কাজকে বারবার ব্যাহত করত।
‘আগে আমি ল্যাপটপে ফাইল ডাউনলোড করতে গেলে ডেটা শেষ হলেই সেটি থেমে যেত। আমাকে আবার এক গিগাবাইট কিনে ডাউনলোড শুরু করতে হতো। এজন্য অনেক প্রজেক্টও ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।’
নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধতা
অন্য ইন্টারনেট সরবরাহ কোম্পানি থাকলেও, ইয়েমেনে আইনগতভাবে অনুমোদিত একমাত্র লো-অরবিট ইন্টারনেট হলো স্টারলিংক। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তি করার পর এটি চালু হয়।
তবে এটি সবার জন্য নয়। কিটের দাম প্রায় ৫০০ ডলার, যা ইয়েমেনের মতো দরিদ্র দেশে অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। এখানে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বাস করেন দারিদ্র্যসীমার নিচে।
একটি ডিশ কেনা তাই অনেক ইয়েমেনির জন্য এখনো দূরের স্বপ্ন।
‘মানুষ ভাউচার ব্যবহার করছে কারণ তারা চড়া দামে স্টারলিংক ডিভাইস কিনতে পারছে না’, বলেছেন হাদরামাউত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মারিয়াম। তিনি আরও বলেছেন, স্থানীয় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে স্টারলিংক অ্যাক্সেসের ভাউচার কেনাও তার নাগালের বাইরে— ডিভাইস কেনা তো আরও দূরের কথা।
স্টারলিংক আসার পর থেকেই সেবাটি বন্ধের জন্য উঠে পড়ে লেগেছে হুতিরা। তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং ঘোষণা দেয়, অনুমতি ছাড়া ডিভাইস ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হুথিদের মতে, কোম্পানিটি ‘মার্কিন গুপ্তচর এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করছে এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তার বড় হুমকি’ তৈরি করছে।
দূরবর্তী এলাকায় সংযোগ
হুতিদের হুমকি ও ইয়েমেনি মানদণ্ডে উচ্চমূল্য সত্ত্বেও স্টারলিংক দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এই সেবা দেশের এমন জায়গায় পৌঁছেছে যা দীর্ঘদিন ছিল বিচ্ছিন্ন ।
মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপার ওমর বানাবেলাহ বলেছেন, স্টারলিংক আসার আগে তার গ্রামের সফর মানেই ডিজিটাল দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। ফোন কল করা যেত না, ইন্টারনেটে সংযোগ তো দূরের কথা। ফলে ক্লায়েন্টদের বার্তার উত্তর দিতে না পারার কারণে তিনি কাজ হারানোর ভয় পেতেন। এখন স্টারলিংক গ্রামীণ এলাকায় পৌঁছেছে, তাই তিনি আর কাজ হারানোর ভয় পান না।
‘আমি যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকে তাদের মেসেজের উত্তর দিতে পারি। স্টারলিংকে যেটা ১০ মিনিটের কাজ, আগের নেটওয়ার্কে হলে পুরো দিন লেগে যেত।’
সূত্র: আলজাজিরা





