কোন দেশের কাছে কত টাকা পাবে ইরান?

একজন ব্যক্তি তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিলবোর্ডের সামনে ইরানের পতাকা বহন করে বিজয়ের চিহ্ন দেখাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কারণে বহু বছর ধরেই দুর্বল ইরানের অর্থনীতি। দেশটির ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকটকে কেন্দ্র করে। এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয় পরবর্তী সময়ে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ঘিরে।
এই পদক্ষেপগুলোর কারণে তেহরান নিজস্ব সম্পদ— বিশেষ করে তেল বিক্রির আয় ব্যবহার করতে পারছে না স্বাভাবিকভাবে। কারণ এসব অর্থ জব্দ অবস্থায় রয়েছে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে।
গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানে প্রথম দফা যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরুর আগে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যেকোনো আলোচনা শুরুর আগে অবশ্যই মুক্ত করতে হবে ইরানের জব্দ করা সম্পদ।
পরদিন ইসলামাবাদে আলোচনায় কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এসব সম্পদ আংশিকভাবে ছাড়তে রাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ওয়াশিংটন সেই দাবি নাকচ করে জানায়, এখনও জব্দই রয়েছে ইরানের সম্পদ।
কত সম্পদ জব্দ রয়েছে?
সঠিক পরিমাণ নির্দিষ্ট না হলেও বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী বিদেশে ইরানের জব্দ সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেছেন, এই জব্দ সম্পদের পরিমাণ ইরান বছরে তেল ও গ্যাস বিক্রি থেকে যা আয় করে, তার প্রায় ৪ গুণ। তবে এই অর্থ ছাড় দেওয়া হলেও তা ব্যবহারের ওপর শর্ত আরোপের শঙ্কা রয়েছে।
কেন ইরানের সম্পদ জব্দ?
১৯৭৯ সালে প্রথম ইরানের সম্পদ জব্দের নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। তখন তেহরানে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল মার্কিন নাগরিকদের। ১৯৮১ সালের কিছু সম্পদ ছাড় দেওয়া হয় আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে।
পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে নতুন করে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ। ২০১৫ সালে পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী ইরান কিছুটা স্বস্তি পেলেও ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেন যুক্তরাষ্ট্রকে। ফলে আবারও জোরদার হয় নিষেধাজ্ঞা।
২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার স্থানান্তর করা হয় কাতারে। পরবর্তী সময়ে নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে সেই অর্থও ইরান ব্যবহরা করতে পারেনি।
কার কাছে কত পাওনা?
বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে রয়েছে ইরানের জব্দ সম্পদ। আনুমানিক হিসাবে— চীনে রয়েছে অন্তত ২০ বিলিয়ন, ভারতে ৭ বিলিয়ন, ইরাকে প্রায় ৬ বিলিয়ন, কাতারে ৬ বিলিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ বিলিয়ন এবং জাপানে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
এছাড়া ইরানের সম্পদ জব্দ রয়েছে ইউরোপের কিছু দেশেও। এরমধ্যে অন্যতম একটি দেশ হচ্ছে লুক্সেমবার্গ। দেশটিতে আটকে আছে ইরানের প্রায় ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞায় চাপে রয়েছে ইরানের অর্থনীতি। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিনিয়োগের অভাবে দেশটি বড় সংকটে পড়েছে। ১০০ বিলিয়ন ডলার প্রায় ইরানের মোট দেশজ উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের সমান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ ছাড় পেলে ইরান মুদ্রার স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং বিনিয়োগ করতে পারবে অবকাঠামো উন্নয়নে। এই অর্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনেও।
সূত্র: আলজাজিরা



