ইসরায়েল কেন হিজবুল্লাহকে হারাতে পারছে না

হিজবুল্লাহর পতাকা উড়াচ্ছে একটি শিশু। ছবি: রয়টার্স
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য সময়টা বেশ প্রতিকূল যাচ্ছে। একদিকে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অন্যদিকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত ইসরায়েলের সামরিক সীমাবদ্ধতা ফাঁস করেছে বিশ্বমঞ্চে। তেল আবিবের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তারা চার দশক ধরে লড়াই করেও হারাতে পারছে না হিজবুল্লাহকে।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রাথমিক মূল্যায়ন ছিল যে দুর্বল হয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। হিজবুল্লাহ কেবল তাদের সক্ষমতা পুনর্গঠনই করেনি, বরং উত্তর ইসরায়েলের শহরগুলোতে নিপুণভাবে এবং তীব্রভাবে আঘাত হানার ক্ষমতা বজায় রেখেছে। হিজবুল্লাহর লড়াইয়ে নামার পর ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা দম্ভ করে বলেছিলেন গোষ্ঠীটি ফাঁদে পা দিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইসরায়েলি সেনাবাহিনীই এখন হিজবুল্লাহর গেরিলা কৌশলের জালে আটকা।
১৯৮২ সালের লেবানন হামলার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে ইসরায়েলের বর্তমান দশা স্পষ্ট। সে সময় ইসরায়েলি বাহিনী মাত্র এক সপ্তাহে বৈরুতে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আজ ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও তারা সীমান্ত থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে লিতানি নদী পর্যন্ত পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে। লেবাননের পাহাড়ি ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক এবং স্থানীয় প্রতিরোধ ইসরায়েলি ট্যাংকের অগ্রযাত্রাকে স্থবির করে দিয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ কেবল বিচ্ছিন্ন গেরিলা সেল হিসেবে নয়, বরং একটি সুসংগঠিত কমান্ড সেন্টারের মাধ্যমে কাজ করছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিজেই স্বীকার করেছে হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে হলে পুরো লেবানন দখল করতে হবে। যা কয়েক বছর সময়সাপেক্ষ। অথচ বর্তমানে ইসরায়েলে রিজার্ভ সৈন্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের ফলে সেনাদের মধ্যে চরম ক্লান্তি ও অবসাদ ভর করেছে।
গাজা যুদ্ধের শুরু থেকে ইসরায়েলের সামরিক বাজেট বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এই বিশাল খরচ ইসরায়েলি অর্থনীতির ওপর অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় এবং লাখ লাখ মানুষকে নিয়মিত বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হওয়ায় অভ্যন্তরীণ জনরোষ বাড়ছে। এমন অবস্থায় লেবাননে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ইসরায়েলি অর্থনীতির নেই।
নেতানিয়াহু এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্ট এক ধরণের ‘সুপার স্পার্টা’ মানসিকতা নিয়ে চলে। যেখানে মনে করা হয় কূটনীতির কোনো প্রয়োজন নেই এবং সব সমস্যা কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান সম্ভব। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং হিজবুল্লাহর পাল্টা প্রতিরোধ প্রমাণ করেছে, আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেও যুদ্ধের ময়দানে কেবল বোমা মেরে জেতা যায় না। 'গ্রেটার ইসরায়েলের’ কল্পনা তখনই সম্ভব যদি প্রতিপক্ষ বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করে। হিজবুল্লাহর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটা অসম্ভব।
নেতানিয়াহু চেয়েছিলেন এই যুদ্ধকে লম্বা করে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখতে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি চাপানো এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর দূরত্ব বজায় রাখার কারণে কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা ইসরায়েল। ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর মধ্যস্থতাকেও ইসরায়েল পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এটি তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতাকে আরও সঙ্কটে ফেলেছে।
ইসরায়েল লেবাননকে একটি ‘স্যাটেলাইট রাষ্ট্র’ বা বশ্যতা স্বীকারকারী দেশে পরিণত করতে চাইলেও হিজবুল্লাহর সামরিক এবং সামাজিক ভিত্তি তা হতে দিচ্ছে না। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ছবি তোলা সহজ। কিন্তু একটি আদর্শভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সামরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব। লেবানন সীমান্ত এখন ইসরায়েলের জন্য সেই দুঃস্বপ্নই হয়ে দাঁড়িয়েছে। হিজবুল্লাহ চার দশক ধরে ইসরায়েলের কাছে একটি ‘খোলা ক্ষত’। যা নিরাময়ের কোনো পথ নেতানিয়াহুর কাছে নেই।
লেখক: একজন রাজনৈতিক কর্মী ও তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী



