ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কি সংঘাত বাড়াতে পারে?

ছবি: রয়টার্স
ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোকে ‘পথনির্দেশনা’ দিয়ে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এমন ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘এটি একটি মানবিক পদক্ষেপ, যা সেসব মানুষ, কোম্পানি ও দেশকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে, যারা কোনো ভুল করেনি।’
ইরান জানিয়েছে, তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে পারবে না। ইরানের সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজের দিকে গুলি ছুড়েছে, যাতে তারা এগোনোর চেষ্টা না করে আর যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা ছোট নৌযান ডুবিয়েছে, যা যুদ্ধবিরতিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা চালানোর পর থেকে প্রায় অচল হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালি। এর প্রতিক্রিয়ায় তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেয়, যার মাধ্যমে চলাচল করে বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস।
জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন জানিয়েছে, এতে আটকে পড়েছেন প্রায় ২০ হাজার নাবিক এবং ২ হাজার জাহাজ।
সরবরাহ কমে যাওয়া এবং নাবিকদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এই অভিযানে ‘গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার, ১০০টির বেশি স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক বিমান, বহুমাত্রিক মানববিহীন প্ল্যাটফর্ম এবং ১৫ হাজার সেনাসদস্য’ ব্যবহার করা হচ্ছে।
অভিযানের প্রথম দিনের ব্রিফিংয়ে সেন্টকম কমান্ডার ব্রাড কুপার বলেছেন, উপসাগরে ৮৭টি দেশের জাহাজ আটকে রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ‘ডজনখানেক জাহাজ ও শিপিং কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যাতে চলাচল শুরু করা যায়।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র এসব জাহাজকে সামরিকভাবে পাহারা দেবে কি না— তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কুপার বলেছেন, শুধু জাহাজ এসকর্ট করার জন্য যতটা প্রয়োজন, তার চেয়ে ‘অনেক বিস্তৃত প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা’ রাখা হয়েছে, তবে বিস্তারিত জানাননি।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা মিক মুলরয় জানান, ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ মূলত আকাশ থেকে সুরক্ষা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধে কেন্দ্রীভূত হবে সরাসরি জাহাজকে এসকর্ট করার পরিবর্তে।
তবে তিনি সতর্ক করেন, এই পরিকল্পনা সফল হবে— এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
তিনি বলেছেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে জাহাজগুলো আক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই পার হতে পারবে কি না এবং আরও গুরুত্বপূর্ণ— বীমা কোম্পানিগুলো কী সিদ্ধান্ত নেবে। যদি না পারে, তাহলে এই প্রচেষ্টা প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলবে না।’
শিপিং সংস্থা ইন্টারট্যাঙ্কোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিম উইকিন্স বলেছেন, বর্তমানে কোনো সুসংগঠিত কনভয় বা সমন্বয় কাঠামো নেই এবং সদস্যরা জানতে চাইছেন—‘কে এই যাত্রা শুরু করবে? কে জাহাজের পক্ষে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবে? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— যদি ইরানি বাহিনী জাহাজকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে?’
২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে হোয়াইট হাউজে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করা মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ গ্রান্ট রামলি বলেছেন, উপসাগরে থাকা সব জাহাজের জন্য নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা ‘খুব, খুব কঠিন’ হবে।
তিনি আরও জানান, এটি করতে হলে আরও শক্তিশালী, আরও ‘কাইনেটিক’ সামরিক বিকল্পের প্রয়োজন হতে পারে— যা তিনি সম্ভাব্য বলেই মনে করেন।
তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয় সাধারণভাবে ধারণা হচ্ছে সংঘাত আবার শুরু হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র— হবে কি না, তা নয়।’
লন্ডনের চাথাম হাউজের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ফেলো নিত্যা লাভ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’।
তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, যা ঘটছে তা পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলছে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি আবার চালুর শর্ত নিয়ে আলোচনায় যেতে আগ্রহী নয়।’
লাভের ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করে নিয়েছে যে, জাহাজ চলাচল অব্যাহত রাখার একমাত্র উপায় হলো ইরানের হামলার হুমকি বা আঘাতের ঝুঁকির মধ্যেই তা চালিয়ে যাওয়া।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ কিছু জাহাজকে হরমুজ প্রণালি থেকে বের করতে সফল হলেও, ‘এটি সর্বোচ্চ সাময়িক স্বস্তি দেবে’— এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পুরোপুরি চালু করতে হলে প্রয়োজন হবে আরও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা।



