বৈরুতে ইসরায়েলি তাণ্ডব, হতাহত নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা

ছবি: এএফপি
আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো পড়ছে বোমা। বিকট শব্দে তা বিস্ফোরিত হচ্ছে, প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে বহু মানুষের, আহত হচ্ছেন তারও বেশি। আঘাত নিয়ে শত শত মানুষ ছুটে আসছেন হাসপাতালে। কান্নায় ভেঙে পড়েছেন কেউ কেউ। অনেকে আতঙ্কিত। শিশুরা খুঁজছে ভাই-বোন বা বাবা-মাকে। বেঁচে আছে নাকি মারা গেছে, জানে না তারা। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরায়েলের তাণ্ডবের পর এমন মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় শহরের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত হাসপাতালে (এএইউবি)।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির মধ্যেই গত বুধবার ১০ মিনিটে দেশজুড়ে ১০০টির বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।
‘এক ঘণ্টারও কম সময়ে আমরা প্রায় ৭৬ জন আহতকে পেয়েছি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাঁচানো যায়নি ৬ জনকে,’ বলছিলেন এএইউবি হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সালাহ জেইনেলদিন। তিনি জানান, ইসরায়েলি হামলার শিকারদের জন্য হাসপাতালটি হয়ে উঠেছিল চিকিৎসার কেন্দ্রবিন্দু।
গতকাল বৃহস্পতিবার লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক তথ্যে জানানো হয়, বুধবার দেশজুড়ে ইসরায়েলের হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩০৩ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৫০ জন।
এএইউবি হাসপাতালে আনা গুরুতর আহতদের মধ্যে অনেকেই শিশু। সবচেয়ে বড় শিশুটির বয়স ১২ বছর। আর যাদের সরাসরি আইসিইউতে নিতে হয়েছে, তাদের দুজনই শিশু। এদের একজন কয়েক মাসের, অন্যজনের বয়স মাত্র কয়েক সপ্তাহ— ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন ডা. জেইনেলদিন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, নিহতদের মধ্যে অন্তত ১১০ জন শিশু, নারী ও বয়স্ক। মৃত্যু ও আঘাতের প্রধান কারণ ছিল বিস্ফোরণ, বিস্ফোরণে ভবন ভেঙে চাপা পড়া এবং ভবনের অংশ ভেঙে পড়ে শরীরে আঘাত লাগা। এর ফলে হাড় ভেঙেছে ও মাথায় আঘাত পেয়েছেন তারা।
যুদ্ধ বা ইসরায়েলি বিমান হামলার সঙ্গে অপরিচিত নয় লেবানন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু সংকট মোকাবিলা করেছেন দেশটির চিকিৎসাকর্মীরা। তবে ডা. জেইনেলদিনের মতে, বুধবারের ঘটনা ছিল ‘সম্পূর্ণ ভিন্ন’। তার ভাষায়, ‘বিশেষ করে বৈরুতে এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এক দিনে এত মানুষ আমরা কখনও হারাইনি। এই মাত্রার হামলা অতীতে কখনো দেখিনি আমরা।’
‘আমাদের কাছে আসা সব রোগীই বেসামরিক নাগরিক।’ কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা স্থানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়নি। হামলাটি ছিল ‘খুবই এলোমেলো’, জানান ডা. জেইনেলদিন। ইসরায়েলের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ। তবে ডা. জেইনেলদিনের মতে, আহতদের মধ্যে শিশু, নারী, পুরুষ, বয়স্কসহ সব ধরনের সাধারণ মানুষই ছিল।
রফিক হারিরি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে এক চিকিৎসা সমন্বয়কারী জানান, ‘আহত বাবা-মায়েরা চিৎকার করে তাদের সন্তানদের খুঁজছিলেন। পরিবারগুলো শিশুদের ছবি নিয়ে এসে জানতে চাইছিল, কেউ তাদের প্রিয়জনকে দেখেছে কি না।’
হামলার পরদিন বৃহস্পতিবারও উদ্ধারকর্মীরা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মানুষ বের করে আনছিলেন। ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে ধারণা করা হচ্ছে। ক্লান্তি ভুলে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন বৈরুতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাকর্মীরা। হোটেল-ডিউ ডি ফ্রান্স হাসপাতালে লেবানিজ রেড ক্রসের প্রেসিডেন্ট ডা. অঁতোয়ান জঘবি ক্লান্ত চোখে বললেন, ‘এটি একটি দুঃস্বপ্ন, একটি দুঃস্বপ্ন।’ চিকিৎসকদের ভাষায়, তারা সংকট মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকেন, কিন্তু বেসামরিকদের ওপর এমন নির্বিচার হামলার মতো পরিস্থিতি কেউ কল্পনাও করেননি।
‘আজকের দিনটি ভিন্ন, কারণ তারা কোনো সতর্কতা ছাড়াই হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে বহু এলাকায় হামলা হয়েছে, এবং তা ছিল ভয়াবহ। এই হামলা ক্ষতি করার জন্য, কষ্ট দেওয়ার জন্য। এটি বেআইনি যুদ্ধ, সীমাহীন যুদ্ধ’, বলেন ডা. জঘবি। তিনি জানান, ওই হাসপাতালে ১৫ জন রোগীকে আনা হয়েছিল।
তিনি আশঙ্কার কথা জানালেন এভাবে, ‘ইসরায়েল এভাবে চালিয়ে গেলে আরও অনেক আহত ও মৃত্যু হবে। এখন পর্যন্ত হাসপাতালগুলো টিকে আছে। কিন্তু দ্বিতীয় বা চতুর্থ দফার হামলা আমরা সামাল দিতে পারব কি না জানি না। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধ থাকবে কি না, তাও অনিশ্চিত।’
বৈরুতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, যুদ্ধ লেবাননের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। বৈরুতের গেইতাউই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের প্রধান ডা. আলাঁ কোর্তবাউই বলছেন, ২০১৯ সাল থেকে চলা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সীমিত ছিল আমদানি-রপ্তানি। সেটিকে আরও কঠিন করে তুলেছে এই যুদ্ধ। হতাশা নিয়ে তিনি বলছেন, ‘ওষুধ আমদানি প্রায় বন্ধ। রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে চালিয়ে যাব, তা আমরা জানি না।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) জানিয়েছে, বড় ধরনের হামলার কারণে বিপুল হতাহত হওয়ায় লেবাননের কিছু হাসপাতালে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়ায় হাসপাতালগুলোও প্রভাবিত হয়েছে বলে জানান ডা. কোর্তবাউই। তার দাবি, এখানে সবকিছু জেনারেটরের ওপর চলে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও চিকিৎসাকর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘হাসপাতালে সরাসরি হামলা না হলে আমরা কাজ চালিয়ে যাব।’ ‘আমি এখনও বুঝতে পারছি না কেন তারা লেবাননের এত জায়গায় হামলা চালিয়েছে’, বলছিলেন এই চিকিৎসক।
এএইউবি হাসপাতালের ডা. জেইনেলদিনের মতে, এই মুহূর্তে লেবাননের মানুষকে সাহায্য করার সবচেয়ে সরাসরি উপায় হলো রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তার ভাষায়, এর সারমর্ম তিনটি শব্দে বলা যায়— ‘যুদ্ধ বন্ধ করুন।’



