আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার
ইরানের ওষুধ ও টিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

সংগৃহীত ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধে প্রত্যক্ষ সামরিক হামলার পাশাপাশি দেশটির ওষুধশিল্প, টিকা উৎপাদন কেন্দ্র এবং চিকিৎসা সরবরাহ ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনে স্বাস্থ্য স্থাপনা সুরক্ষিত থাকলেও এই হামলা ও নিষেধাজ্ঞাগুলো ইরানের সাধারণ নাগরিকদের জন্য ওষুধ ও চিকিৎসা দুর্লভ করে তুলছে।
গত বৃহস্পতিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর কাছে ইরানের চিকিৎসা স্থাপনাগুলোতে হামলার প্রতিক্রিয়া জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি রাজধানী তেহরানে অবস্থিত পাস্তুর ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে হামলার বিষয়টি তুলে ধরেন। যেগুলো ওই দিনই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২ হাজার ৭৬ জন নিহত এবং ২৬ হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার মাসউদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি পোস্টে লেখেন, ‘হাসপাতাল, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং ইরানের একটি চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্র পাস্তুর ইনস্টিটিউটের মতো চিকিৎসা গবেষণা কেন্দ্রে হামলা কী বার্তা দেয়?’
পেশায় হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এই ৭১ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট আরও লেখেন, ‘একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), রেড ক্রস, মেডেস সাঁ ফ্রন্তিয়ের (ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস) এবং বিশ্বের সকল চিকিৎসকদের এই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই।
পাস্তুর ইনস্টিটিউট কেন গুরুত্বপূর্ণ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এক্স পোস্টে লেখেন, ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য গবেষণা কেন্দ্র। এটি ১৯২০ সালে প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউট ও ইরান সরকারের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। আমেরিকান-ইসরায়েলি আগ্রাসীরা ইরানের সেই পাস্তুর ইনস্টিটিউটে হামলা চালিয়েছে।’
এই প্রতিষ্ঠান সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা, ভ্যাকসিন উৎপাদন এবং উন্নত ডায়াগনস্টিক সেবা প্রদান করে। গুটি বসন্ত ও কলেরার মতো রোগ মোকাবিলায় এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি এটি জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে টিটেনাস, হেপাটাইটিস বি ও হামসহ বিভিন্ন রোগের ভ্যাকসিন সরবরাহ করে।
ইসমাইল বাঘাই এই হামলাকে হৃদয়বিদারক, নিষ্ঠুর, জঘন্য ও সম্পূর্ণ বর্বর বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এই হামলায় কোনো হতাহতের বিষয়ে নির্দিষ্ট কিছু জানাননি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেইয়েসুস গতকাল শুক্রবার এক্স পোস্টে লেখেন, ইরানের পাস্তুর ইনস্টিটিউটের দুটি বিভাগ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তিনি আরও লেখেন, ‘সংঘাতের কারণে স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।’
ইরানের আর কোন চিকিৎসা কেন্দ্রে হামলা হয়েছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মার্চের শুরু থেকে ইরানে ২০টির বেশি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে। এতে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন সংক্রামক রোগের স্বাস্থ্যকর্মী ও একজন ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সদস্য ছিলেন।
যেসব স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
রেড ক্রিসেন্ট গুদাম: শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকালে একটি ড্রোন হামলা ইরানের বুশেহর প্রদেশে রেড ক্রিসেন্টের একটি ত্রাণ গুদামে আঘাত হানে। ফার্স সংবাদ সংস্থা জানায়, হতাহতের খবর না পাওয়া গেলেও হামলায় দুটি ত্রাণ কন্টেইনার, দুটি বাস ও জরুরি যানবাহন ধ্বংস হয়েছে।
তোফিঘ দারু কোম্পানি: গত ৩১ মার্চ ইসরায়েল-মার্কিন হামলায় ইরানের বৃহত্তম ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর একটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ইরান সরকার এক্স পোস্টে এ তথ্য জানায়। কোম্পানিটিকে পরে তোফিঘ দারু গবেষণা ও প্রকৌশল কোম্পানি হিসেবে শনাক্ত করা হয়। এটি রাষ্ট্রায়ত্ত হোল্ডিং ফার্ম সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির মালিকানাধীন।
কোম্পানিটি সক্রিয় ফার্মাসিউটিক্যাল উপাদান ‘অ্যান্টিক্যানসার, নারকোটিকস, কার্ডিওভাসকুলার থেকে ইমিউনোমডুলেটরি সেগমেন্টে’ উন্নয়ন ও উৎপাদন করে বলে তাদের লিংকডইন পেজে জানানো হয়েছে। এই হামলায় নিশ্চিত হতাহতের কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি।
দেলারাম সিনা মানসিক হাসপাতাল: রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএয়ের তথ্যানুযায়ী, ২৯ মার্চ রাজধানীতে হামলার সময় তেহরানের এই নতুন নির্মিত হাসপাতালটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত সোমবার রাতে হামলার সময় হাসপাতালটিতে প্রায় ৩০ জন রোগী ছিলেন বলে হাসপাতালের পরিচালক আইআরএনএকে জানান। হাসপাতালের জন্য নির্দিষ্ট হতাহতের কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি।
আলি হাসপাতাল: মেহের ও ফার্স সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, ২১ মার্চ ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের আনদিমেশক শহরের এই হাসপাতালটি একটি বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তার পোস্টে ঘেব্রেইয়েসুস এই হামলা নিশ্চিত করেন এবং বলেন, স্থাপনাটি কর্মীদের সরিয়ে নিতে ও সেবা বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। হাসপাতালে হতাহতের বিষয়ে প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ নেই।
গান্ধী হাসপাতাল: গত বৃহস্পতিবার তেহরানের গান্ধী হাসপাতাল কাছের একটি টেলিভিশন যোগাযোগ টাওয়ারের ওপর হামলার সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাসপাতালটির জন্য নিশ্চিত হতাহতের কোনো সংখ্যা জানানো হয়নি।
আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির মতে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বলে স্বাস্থ্য স্থাপনা ও ইউনিট হাসপাতাল আক্রমণের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। এই সুরক্ষা অসুস্থ ও আহত ব্যক্তি, চিকিৎসা কর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্সের মতো পরিবহনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এসব স্থাপনার সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
২০১৬ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজোলিউশন ২২৮৬ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এটি স্বাস্থ্যসেবায় হামলার নিন্দা করে এবং দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার আহ্বান জানায়।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবায় হামলার সংখ্যা বেড়েছে। এসএসএ জানায়, বিশ্বব্যাপী সশস্ত্র সংঘাতে চিকিৎসাকেন্দ্রে ১ হাজার ৩৪৮টি হামলায় ১ হাজার ৯৮১ জন নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশ মৃত্যু সুদানে ১ হাজার ৬২০ জন, তারপরে মিয়ানমারে ১৪৮ জন। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় তীব্র বৃদ্ধি, যখন সশস্ত্র সংঘাতে ৯৪৪ জন রোগী ও চিকিৎসাকর্মী নিহত হন।
লেবানন: ইরানের পাশাপাশি ইসরায়েলি হামলা লেবাননের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে। লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, লেবাননে সর্বশেষ বোমাবর্ষণ শুরুর এক মাসের মধ্যে ইসরায়েল ৫৩ জন চিকিৎসাকর্মীকে হত্যা করেছে, ৮৭টি অ্যাম্বুলেন্স বা চিকিৎসা কেন্দ্র ধ্বংস করেছে এবং পাঁচটি হাসপাতাল বন্ধ করতে বাধ্য করেছে।
গাজা: গাজায় সংঘাত চলাকালে হাসপাতাল ও চিকিৎসা কেন্দ্রে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে আল-আহলি হাসপাতালে হামলায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয় বলে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানান।
২০২৪ সালের মার্চে আল-শিফা হাসপাতালে অভিযানে বহু মানুষ নিহত হয় এবং অনেককে আটক করা হয়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে কামাল আদওয়ান হাসপাতালের পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৫ সালের মার্চে রাফাহ এলাকায় উদ্ধার অভিযানের সময় ১৫ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মী নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এই সংঘাত যেন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মানবতার আশ্রয়স্থল হাসপাতালগুলোকেও আগুনের বৃত্তে টেনে এনেছে। চিকিৎসাসেবার ওপর এই আঘাত যুদ্ধের আরেকটি নীরব কিন্তু গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে যাচ্ছে।

