যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের ৫০তম দিনে যা ঘটছে
- হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত

সংগৃহীত ছবি
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শনিবার পৌঁছেছে ৫০তম দিনে। এ যুদ্ধের স্থায়ী সমাধান টানতে চলছে নানা রকম বৈশ্বিক প্রচেষ্টা।
এর মধ্যেই ইরান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের কর্মকর্তারা। ট্রাম্পের বার্তায় গভীর অসংগতি রয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি ঘিরে অব্যাহত রয়েছে উত্তেজনা।
ট্রাম্প দাবি করেছেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে নেই আর কোনো ‘অমীমাংসিত বিষয়’। তিনি হুমকি দিয়েছেন, চুক্তি ‘১০০ শতাংশ সম্পূর্ণ’ না হওয়া পর্যন্ত বহাল থাকবে ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মতে, লেবাননের যুদ্ধবিরতি এবং পূর্বনির্ধারিত সামুদ্রিক রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ খোলা রয়েছে হরমুজ প্রণালি। তবে কিছু শর্তের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তেহরান হুমকি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ চালিয়ে যায়, তবে বন্ধ করে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালিও।
সংঘাতের ৫০তম দিনে যা ঘটছে
ইরান
সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে বিরোধ: ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ স্থানান্তর করা হবে না ‘কোথাও’। তবে এর আগে ট্রাম্প দাবি করেন, এটি হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে তেহরান।
হরমুজ ফি পরিকল্পনা: ইরান বলেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে আরোপ করবে না ‘প্রচলিত’ ট্রানজিট ফি। তবে নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ির ভাষ্য, জাহাজের মালিকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার একটি আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে ‘প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিতে’। তিনি আরও যোগ করেন, জাহাজগুলো শুধু ইরানি কর্তৃপক্ষের পূর্বসমন্বয়ের মাধ্যমে চলাচল করতে পারবে এবং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকবে শত্রুভাবাপন্ন সামরিক জাহাজ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মালিকানাধীন।
যুদ্ধ কূটনীতি
লেবানন-ইসরায়েল ‘চুক্তি’: লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন মন্তব্য করেছেন, যুদ্ধবিরতির (ইসরায়েলের সঙ্গে) পর লেবানন রয়েছে স্থায়ী চুক্তির একটি ‘নতুন পর্যায়ে’ পৌঁছানোর পথে।
ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের হরমুজ মিশন: ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, ‘পরিস্থিতি অনুকূল হলেই’ ফ্রান্স ও ব্রিটেন হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় নেতৃত্ব দেবে একটি বহুজাতিক প্রচেষ্টার।
চীন সফরের ইঙ্গিত: ট্রাম্পের ভাষ্য, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং হরমুজ পুনরায় খোলার পক্ষে। ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন চীনে একটি ‘সম্ভাব্য ঐতিহাসিক’ সফরের।
লেবাননের প্রতি সংহতি হুতিদের: সানায় এক সমাবেশে লেবাননের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে হুতিরা। ইরান-সমর্থিত ও সশস্ত্র হুতিরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে প্রয়োজনে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার। তারা নিয়ন্ত্রণ করে উত্তর ইয়েমেন।
উপসাগরীয় অঞ্চল
ভঙ্গুর পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার: সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদান ইরানের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর। তার ভাষ্য, দ্রুত উৎপাদন পুনরায় শুরু করতে পারে কিছু দেশ। অন্যদের লাগবে আরও সময়।
যুক্তরাষ্ট্র
রুশ তেলের ছাড় বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ একটি ছাড়ের মেয়াদ বাড়িয়েছে, যাতে অন্য দেশগুলোকে সমুদ্রে নিষিদ্ধ রুশ তেল কিনতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে ১৬ মে পর্যন্ত। যুদ্ধজনিত বিঘ্নের সময় বৈশ্বিক সরবরাহ স্থিতিশীল রাখাই এর লক্ষ্য।
ইরানের বন্দর অবরোধ বহাল: ইরানের বন্দর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বহাল রয়েছে এবং ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ২১টি জাহাজ মেনে নিয়েছে ইরানি বন্দর থেকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ।
আলোচনায় চাপের ইঙ্গিত ট্রাম্পের: আলোচনা ‘খুব ভালো চলছে’ বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, যুদ্ধবিরতি বাড়ানো নাও হতে পারে কোনো চুক্তি না হলে। তেহরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর করতে পারে বলেও দাবি করেছেন তিনি। তবে তা অস্বীকার করেছে ইরান।
ন্যাটোর প্রস্তাব নাকচ ট্রাম্পের: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হরমুজ প্রণালিতে সহায়তায় ন্যাটোর প্রস্তাব নাকচ করে সামরিক জোটটিকে আখ্যায়িত করেছেন ‘কাগুজে বাঘ’ বলে। তাদের ‘দূরে থাকতেও’ বলেছেন তিনি।
ইসরায়েল
লেবাননে হামলা চালাতে বারণ: ট্রাম্পের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে বাধা দিয়েছে লেবাননে হামলা চালিয়ে যেতে এবং ঘোষণা করেছে ‘যথেষ্ট হয়েছে’।
অভিযান শেষ নয়: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সতর্ক করেছেন, অভিযান শেষ হয়নি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে। আমরা কাজ শেষ করিনি এখনো। অভিযানের একটি প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘হিজবুল্লাহকে ভেঙে ফেলা’, যোগ করেন তিনি।
লেবানন
যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও একজন নিহত: লেবাননের গণমাধ্যম জানিয়েছে, ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি শুরুর পরও দেশটির দক্ষিণে একটি মোটরসাইকেলের ওপর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হয়েছেন একজন।
লেবাননে নিহত ২,৩০০: লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, গত ২ মার্চ থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩০০ জন।
লেবানন যুদ্ধ ‘শেষ উপনিবেশবিরোধী লড়াই’: মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতি বিশ্লেষক জর্ডানীয়-আমেরিকান সাংবাদিক রামি খৌরি মনে করেন, এই সংঘাত প্রতিফলিত করে কয়েক দশকের পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধকে, যার কেন্দ্র দক্ষিণ লেবানন। তিনি যুক্তি দেন, ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ তৈরির জন্য ইসরায়েলের প্রচেষ্টা থামিয়ে দিয়েছে হিজবুল্লাহ ও ইরান। এটি সংঘাতকে সরিয়ে নিতে পারে আলোচনার দিকে।
বিশ্ব অর্থনীতি
কমেছে তেলের দাম, শেয়ারবাজারে উল্লম্ফন: ইরানের হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার ঘোষণায় শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট (নিউ ইয়র্ক শেয়ার বাজারের কেন্দ্র) রেকর্ড ছুঁয়েছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১২০ ডলার থেকে নেমে ব্রেন্ট ক্রুডের জন্য পৌঁছায় ৯০ দশমিক ৩৮ ডলারে।
বোয়িংয়ের যুদ্ধজনিত সুবিধা: কোম্পানিটির সিইওর মতে, এই যুদ্ধ এখন পর্যন্ত বোয়িংয়ের প্রতিরক্ষা ব্যবসাকে বাড়িয়ে দিয়েছে এবং উচ্চ জেট জ্বালানির দামের মুখোমুখি বিমান সংস্থাগুলোর কাছে সরবরাহে ফেলেনি কোনো প্রভাব।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা



