ইরানে ভূপাতিত পাইলটের তথ্য ফাঁস
‘গোপন সূত্রের’ পরিচয় প্রকাশ না করলে জেল, সংবাদমাধ্যমকে ট্রাম্পের হুমকি

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গোপন সূত্র প্রকাশ না করলে সংবাদমাধ্যমকে জেলে পাঠানোর হুমকি দিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। ইরানে নিখোঁজ এক মার্কিন বিমানচালককে ঘিরে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের এক যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর একজন বিমানচালক ইরানের ভেতরে নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও পুরো অভিযানের সময় তথ্য ফাঁস বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।’
ট্রাম্পের দাবি, ওই গোপন তথ্য প্রকাশের আগ পর্যন্ত ইরান জানত না যে তাদের ভূখণ্ডে কোনো মার্কিন সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর ইরান সতর্ক হয়ে যায়, ফলে উদ্ধার অভিযান আরও জটিল হয়ে পড়ে।
তার ভাষ্য, হঠাৎ করেই তারা জেনে গেল সেখানে কেউ আছে। তারা আকাশে বিমান চলাচল দেখেছে, পরিস্থিতি কঠিন হয়ে গেছে। এই তথ্য ফাঁস না হলে অভিযান অনেক সহজ হতো।
এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ট্রাম্প জানান, তথ্য ফাঁসকারীর পরিচয় জানতে তদন্ত চলছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে বাধ্য করা হবে সূত্রের নাম প্রকাশ করতে।
তিনি বলেছেন, ‘আমরা সংবাদমাধ্যমের কাছে যাব এবং বলব, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তথ্য দিন, না হলে জেলে যেতে হবে।’
তবে কোন সংবাদমাধ্যম এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা তিনি স্পষ্ট করেননি। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ওই তথ্য ফাঁসের কারণে শুধু একটি নয়, বরং একাধিক সদস্যের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তিনি বলেছেন, ‘একজনকে উদ্ধার করা হলেও আরও একজনকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছিল, যা ফাঁস হওয়ায় অভিযান কঠিন হয়ে যায়।’
এ সময় তিনি গোপন সূত্রকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেছেন, ওই ব্যক্তি হয়তো পুরো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারেননি। তবে সতর্ক করে দেন, ‘যে এই প্রতিবেদন করেছে, সে যদি সূত্র না জানায়, তাকে জেলে যেতে হবে।’
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
ট্রাম্পের এই বক্তব্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকদের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো গোপন সূত্রের পরিচয় রক্ষা করা। এটি না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্যই সামনে আসবে না।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক জামিল জাফার বলেছেন, জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা সংবাদমাধ্যমের সাংবিধানিক অধিকার।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সূত্র প্রকাশে চাপ দেওয়া মানে সাংবাদিকদের ভয় দেখানো এবং তাদের কাজ বাধাগ্রস্ত করা।
একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ক্লেটন ওয়েইমার্স। তিনি বলেছেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম এমন পদক্ষেপ নয়। অতীতেও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নজির রয়েছে।
তথ্য ফাঁস সংক্রান্ত তদন্তে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আগের একটি নীতিমালা বাতিল করে, যা সাংবাদিকদের গোপন সূত্র রক্ষায় সুরক্ষা দিত।
এর ফলে তদন্তের স্বার্থে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তলব, এমনকি তাদের ব্যক্তিগত ডিভাইস জব্দ করার পথ আরও সহজ হয়ে যায়।
সম্প্রতি একটি ঘটনায় ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার এক সাংবাদিকের বাসায় তল্লাশি চালানো হয় এবং তার ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। যদিও পরে এক বিচারক এ ধরনের তল্লাশিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সব সময়ই একটি সংবেদনশীল বিষয়। তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি সেই ভারসাম্যকে আরও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট



