মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান
ইরান পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেনি

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড। ছবি: সংগৃহীত
যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবার, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হলেন।
গতকাল বুধবার আইনপ্রণেতারা ক্যাপিটল হিলে অনুষ্ঠিত গোয়েন্দা সংস্থার বার্ষিক বৈশ্বিক হুমকি মূল্যায়ন শুনানিতে গ্যাবার্ড, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেল এবং অন্যান্য জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কাছে ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
গ্যাবার্ডকে জানুয়ারিতে জর্জিয়ার একটি নির্বাচনী কেন্দ্রে এফবিআইয়ের অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়।
এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয় ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকর্তা জো কেন্টের পদত্যাগের একদিন পর। তিনি যুদ্ধের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করেন এবং যুক্তি দেন, ইরানের দিক থেকে কোনো ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ ছিল না।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, গত গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। তবে বর্তমান যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি হিসেবে হোয়াইট হাউস জানায়, তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি তাৎক্ষণিক পারমাণবিক হুমকি তৈরি করেছিল।
শুনানিতে ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জন ওসফ ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন নিয়ে গ্যাবার্ডকে প্রশ্ন করেন।
তার উত্তরে গ্যাবার্ড বলেছেন, তাৎক্ষণিক হুমকি নির্ধারণ করার ক্ষমতা একমাত্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই রয়েছে।
সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যখন আক্রমণ চালিয়েছিল তখন দেশটি ওয়াশিংটনের জন্য ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ ছিল।
তিনি উল্লেখ করেছেন, ইরান এমন কিছু উস্কানিমূলক কাজ করছিল যেগুলো থেকে তিনি বুঝতে পেরেছেন দেশটি হুমকি সৃষ্টি করছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলাকালে দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়ানো।
শুনানিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গ্যাবার্ডের বক্তব্য ছিল প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্পূর্ণ বিপরীত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করার কয়েক দিন আগে তার স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণে বলেছিলেন, তাদের সতর্ক করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে তাদের অস্ত্র কর্মসূচি, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র পুনর্নির্মাণের চেষ্টা না করে। তবুও তারা অব্যাহত রাখছে, তারা সব আবার শুরু করছে।
কিন্তু বুধবার গ্যাবার্ড লিখিত বক্তব্যে কংগ্রেসকে জানান, ইরান প্রকৃতপক্ষে তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্নির্মাণের ‘কোনো চেষ্টা’ করেনি।
সিনেটর জন ওসফ প্রশ্ন করেন, এটা কি গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন? উত্তরে গ্যাবার্ড বলেছেন, হ্যাঁ।
সিআইএ পরিচালক র্যাটক্লিফ বলেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থা তার পারমাণবিক উপাদান সমৃদ্ধির কাজ বন্ধ করেছে। গত গ্রীষ্মের হামলার কারণে তেহরান ইউরেনিয়াম ৬০% সমৃদ্ধ করতে অক্ষম এবং অনিচ্ছুক।
উদ্বোধনী বক্তব্যে মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান ইরান বিষয়ে গোয়েন্দাদের সর্বশেষ মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
গ্যাবার্ড উল্লেখ করেছেন, ইরান ২০৩৫ সালের আগে এমন একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পারে যা যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। ‘এটি মার্কিন গোয়েন্দাদের একটি পুরোনো মূল্যায়ন। প্রশাসন এই মূল্যায়নকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার একটি যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান শুনানিতে বেশকিছু দেশের নাম উল্লেখ করেন যেসব দেশ উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে এবং সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। তিনি বলেছেন, রাশিয়া, চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং পাকিস্তান নতুন, উন্নত বা প্রচলিত ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলি — যেগুলো পারমাণবিক এবং প্রচলিত যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে সক্ষম — গবেষণা ও উন্নয়ন করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যেন তা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারে।
‘পাকিস্তানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচিতে এমন আইসিবিএম অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে আঘাত হানতে সক্ষম,’ তিনি যোগ করেন।
শুনানিতে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে গ্যাবার্ড বলেছেন, ইরানি শাসনব্যবস্থা আপাতদৃষ্টিতে ‘অক্ষত’ মনে হলেও কিন্তু ‘ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত’ হয়েছে।
‘ইরানের প্রচলিত সামরিক শক্তি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে তাদের হাতে সীমিত বিকল্প রয়েছে। দেশটির কৌশলগত অবস্থানও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে’, যোগ করেন মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান।
গ্যাবার্ড সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে কারণ অর্থনীতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
মার্কিন গোয়েন্দাপ্রধান জানিয়েছেন, যদি এই শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তবে তারা সম্ভবত তাদের সামরিক শক্তি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন বাহিনী পুনর্নির্মাণের জন্য প্রচেষ্টা শুরু করবে।
সূত্র: এবিসি নিউজ ও ডন

