ইরান যুদ্ধ কীভাবে মার্কিন শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্রকে ধ্বংস করে দিল

সংগৃহীত ছবি
১৯৭৭ সালে ডেনমার্কের বিখ্যাত দাবা গ্র্যান্ডমাস্টার বেন্ট লারসেনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি ভাগ্যবান হতে চান নাকি দক্ষ? সংক্ষিপ্ত উত্তরে তিনি জানান দুটোই। তার এই কথাটি ব্যবহার করা হয় বিশিষ্ট মার্কিন অর্থনীতিবিদ কেনেথ রোগফের লেখা ‘আওয়ার ডলার, ইউর প্রবলেম’ বইয়ে। বইটি প্রকাশিত হয় ২০২৫ সালে। মার্কিন ডলারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য তুলে ধরতেই এই কথাটি ব্যবহার করেছেন তিনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন ডলারের অভূতপূর্ব আধিপত্য গড়ে উঠেছিল দক্ষতা ও ভাগ্যের সমন্বয়ে।
১৯৬০ সালের মাঝামাঝিতে রাশিয়ার অর্থনীতি উদারীকরণ, ১৯৮০ সালে জাপানকে অস্থিতিশীল মুদ্রা মূল্যায়নের জন্য বাধ্য করা, কিংবা ২০১০ সালে চীন যদি তাদের বিনিময় হার ভাসমান করত, তাহলেও ডলার শীর্ষে থাকত, কিন্তু এতটা নয়। সুদের হার বেশি থাকত, আর কম হতো তথাকথিত অসামান্য সুবিধাও।
রোগফের বইয়ের শিরোনামটি ১৯৭০ সালের শুরুতে নিক্সনের ট্রেজারি সচিব জন কনালির বিখ্যাত মন্তব্য ‘এটা আমাদের ডলার, কিন্তু সমস্যাটা তোমাদের’ থেকে নেওয়া। উক্তিটি ছিল আমেরিকান অহংকারের নিখুঁত উদাহরণ। এটি একইসঙ্গে তুলে ধরে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রও। মুদ্রা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। আর তার প্রভাব বহন করে বাকি বিশ্ব।
সৌদি চুক্তি ও পেট্রোডলারের উত্থান
১৯৭৪ সালে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। এর আওতায় সৌদি আরব তেলের দাম নির্ধারণ করবে ডলারে এবং বিাড়তি অর্থ বিনিয়োগ করবে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে। এর বিনিময়ে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে এতে যুক্ত হয় উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের অন্য দেশও।
২০২৩ সালে আমেরিকান আর্থিক পরিষেবা সংস্থা জেপি মরগ্যান চেজ জানায়, এখনও ডলারে নিষ্পত্তি হয় বৈশ্বিক তেল লেনদেনের প্রায় ৮০ শতাংশ।
এই পেট্রোডলার ব্যবস্থার সৌন্দর্য ছিল এর চক্রাকার প্রবাহে। তেল আমদানিকারকরা ডলারে মূল্য পরিশোধ করত। সেই ডলার যেত রিয়াদ ও আবুধাবিতে। সেখান থেকে সেগুলো আবার মার্কিন ঋণে ফিরে আসত।
এই প্রক্রিয়া অর্ধশতাব্দী ধরে কমিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ গ্রহণের খরচ। এটি বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে ডলারকে। পাশাপাশি সোসাইটি ফর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইন্টারব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল টেলিকমিউনিকেশন (সুইফট) নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পেয়েছে একটি শক্তিশালী আর্থিক অস্ত্র। যার মাধ্যমে কোনো দেশকে মুহূর্তে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেওয়া সম্ভব। এটি ঘটেছে ২০১২ সাল থেকে ইরান এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার সঙ্গে।
২০২২ সালে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ জব্দ করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে তারা দেখিয়ে দেয় ডলার সঞ্চয় মানেই নিরাপদ সম্পদ নয়, তা রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। এই ঘটনাই অনেক দেশের কাছে একটি সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের হামলার অনেক আগেই বদলে গিয়েছিল অনেক কিছু। মার্কিন শেল বিপ্লবের ফলে যুক্তরাষ্ট্র এখন জ্বালানি-স্বনির্ভর। ফলে সৌদি আরব এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চার গুণ বেশি তেল বিক্রি করছে চীনে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশ তেল যাচ্ছে এশিয়ায়।
এর পাশাপাশি সৌদি আরব যুক্ত হয়েছে প্রজেক্ট এমব্রিজে। এটি চীনসহ কয়েকটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি ব্লকচেইনভিত্তিক লেনদেন ব্যবস্থা। এটি আন্তর্জাতিক লেনদেন সম্ভব করে ডলার বা সুইফট ছাড়াই।
অর্থাৎ, ডলারবিহীন লেনদেনের অবকাঠামো এখন তৈরি। এখন শুধু ব্যবহারের অপেক্ষা।
ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত সপ্তাহে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। একই সঙ্গে এটি চাপ সৃষ্টি করেছে পেট্রোডলার ব্যবস্থার দুই প্রান্তেই।
তেল আমদানিকারক দেশগুলো তাদের মুদ্রা রক্ষা করতে বিক্রি করছে মার্কিন ট্রেজারি। অন্যদিকে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে, কমেছে আয়, বেড়েছে ব্যয়। ফলে আগের মতো বাড়তি অর্থ আর ফিরে যাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রে।
প্রথমবারের মতো বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন বেশি সোনা ধারণ করছে মার্কিন বন্ডের চেয়ে।
পেট্রোইউয়ান ও বিকল্প লেনদেন
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা জাহাজের ওপর এখন চীনা ইউয়ানে টোল আরোপ করছে ইরান। যদিও ইউয়ান এখনো পুরোপুরি মুক্তভাবে রূপান্তরযোগ্য নয়, তবুও এটি একটি বড় সংকেত। ডলার ছাড়াও কার্যকর হতে শুরু করেছে বিকল্প ব্যবস্থা।
ভুল প্রশ্ন, সঠিক উত্তর
অনেক অর্থনীতিবিদ যুক্তি দেন, ডলারের বিকল্প হতে পারবে না ইউয়ান। এটি আংশিক সত্য। কিন্তু মূল প্রশ্ন এটি নয় যে ইউয়ান কবে ডলারকে প্রতিস্থাপন করবে।
মূল প্রশ্ন হলো—ডলারের সবচেয়ে বড় শক্তি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের ক্ষমতা। বিকল্প ব্যবস্থার উত্থানের ফলে কার্যকর থাকবে কতটা?
বিশ্ব ধীরে ধীরে তেলনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে যাচ্ছে। চীন ইতোমধ্যেই নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌর প্যানেল, উইন্ড টারবাইন ও ব্যাটারি উৎপাদনে।
যদি বিশ্ব কম তেল বাণিজ্য করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই চাহিদাও কমবে ডলারের।
সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্বীকার করেছেন, অনেক দেশ ডলার এড়িয়ে নিজেদের মুদ্রায় বাণিজ্য শুরু করছে। কয়েক বছরের মধ্যেই কঠিন হয়ে যেতে পারে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখা।
অর্থনীতিবিদ ব্যারি এইচেনগ্রিন স্মরণ করিয়ে দেন, রোমান সাম্রাজ্যের মুদ্রা ডেনারিয়াসের পতন শুরু হয়েছিল যখন সম্রাট নেরো যুদ্ধ ও বিলাসিতার খরচ মেটাতে কমিয়ে দেন মুদ্রার মান। অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার আগেই দুর্বল হয়েছিল মুদ্রা।
হঠাৎ করে হারিয়ে যাবে না ডলার। যেমন এখনও টিকে আছে ব্রিটিশ পাউন্ড। কিন্তু অপ্রতিদ্বন্দ্বী আধিপত্য আর কোনো বিকল্প নেই, এই দুইয়ের মধ্যে বাড়ছে পার্থক্য।
ডলারের শক্তি এখনও আছে, কিন্তু তার ভাগ্যের দিকটা হয়তো ধীরে ধীরে ক্ষয়িষ্ণু। ঠিক যেমন বেন্ট লারসেন বলেছিলেন, শুধু দক্ষতা নয়, ভাগ্যও দরকার। আর সেই ভাগ্যই ফুরিয়ে আসছে এখন।
এনডিটিভি থেকে ভাষান্তর: মাকসুদা রিনা



