ব্যাংক খাতে দ্বৈত চিত্র : রেকর্ড মুনাফা বনাম ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমন

সংগৃহীত ছবি
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যখন সূচকগুলো নিম্নমুখী, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা লোকসানে দিশেহারা, তখন ব্যাংকিং খাতে দেখা দিয়েছে একধরনের বিস্ময়কর ও দ্বৈত চিত্র। একদিকে বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক হাজার কোটি টাকার মুনাফার রেকর্ড অর্জন করেছে, অন্যদিকে একই সময়ে একাধিক ব্যাংক লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়ে শেয়ারবাজারের সর্বনিম্ন স্তর বা ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গেছে। এই বিপরীত চিত্র দেশের ব্যাংক খাতের আসল আর্থিক অবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এই বৈপরীত্য ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক স্বাস্থ্যের প্রতিফল নয়; বরং ‘হিসাবের জাদু’ এবং ‘নীতি সহায়তার’ ফল। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে বর্তমানে মুনাফা বাড়ছে কাগজে-কলমে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছে তারল্য ও মূলধনের বড় ক্ষত।
২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ২৫০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা সিটি ব্যাংক মুনাফা করেছে ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি পূবালী ব্যাংক প্রথমবারের মতো ‘হাজার কোটির ক্লাবে’ প্রবেশ করেছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকও উল্লেখযোগ্য মুনাফা অর্জন করেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ব্যাংক এখন মূল ঋণ ব্যবসার চেয়ে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী। বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার উচ্চ সুদে ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে, ফলে ঝুঁকিহীন এই বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকগুলো নিশ্চিত মুনাফা অর্জন করছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড়ের কারণে অনেক খেলাপিঋণকে নিয়মিত হিসাবে দেখানো হচ্ছে, ফলে প্রভিশন সংরক্ষণ কমে গিয়ে কাগজে মুনাফা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মুনাফার এই চাকচিক্যের আড়ালে ধসে পড়ছে কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি। আজ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) আনুষ্ঠানিকভাবে ১০টি ব্যাংককে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনমিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি), প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ওয়ান ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংক।
শেয়ারবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, টানা দুই বছর লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হলে সেই কোম্পানিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে মুনাফা থাকলেও বাস্তবে লভ্যাংশ দেওয়ার মতো নগদ অর্থ নেই। অনেক ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি ও তারল্য সংকটে ভুগছে। ফলে কাগজে মুনাফা দেখালেও বিনিয়োগকারীরা থাকছেন শূন্য হাতে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান ব্যাংকিং খাতে তিনটি সমান্তরাল ঝুঁকি কাজ করছে। প্রথমত, ব্যাংকগুলো এখন ‘প্রফিট মেকিং মেশিন’ হিসেবে কাজ করলেও অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান বা বিনিয়োগ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে না। দ্বিতীয়ত, খেলাপিঋণ আড়াল করার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতকে ঝুঁকিতে ফেলছে। তৃতীয়ত, একই খাতে একসঙ্গে সমৃদ্ধি ও দেউলিয়া হওয়ার চিত্র বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ফাটল ধরাচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত এখন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গুটিকয়েক ব্যাংকের আকাশচুম্বী মুনাফা, অন্যদিকে অধিকাংশ ব্যাংকের লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা হারানো— এটি কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ হতে পারে না।
এখনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কঠোর নজরদারি ও হিসাব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এই ‘কাগুজে মুনাফার’ বুদবুদ যেকোনো সময় ফেটে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



